চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ডের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বিদেশি কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ১৫ বছরের জন্য দেওয়ার চুক্তি বাতিলের দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন ঢাকা মহানগর সংসদের সদস্য ও বৃহত্তর উত্তরা থানা সংসদের সাংগঠনিক সম্পাদক ইব্রাহিম সিকদার। একই সঙ্গে চুক্তির প্রতিবাদে আজ রাজধানীর বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ভবনের সামনে সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোটের বিক্ষোভ কর্মসূচিতে পুলিশের লাঠিচার্জের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান তিনি।
এক বিবৃতিতে ইব্রাহিম সিকদার বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতি, বৈদেশিক বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। এই বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ কনটেইনার টার্মিনাল নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ১৫ বছরের জন্য একটি বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে শুধু একটি সাধারণ বাণিজ্যিক চুক্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, বন্দর ব্যবস্থাপনা, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন জড়িত।
জনগণের সঙ্গে কার্যকর আলোচনা না করে এবং বন্দর শ্রমিক-কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর উদ্বেগের যথাযথ সমাধান না করেই দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি বন্দর টার্মিনালের পরিচালনার দায়িত্ব ১৫ বছরের জন্য বিদেশি কোম্পানির হাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হলো—এটি এখন জনগণের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। চট্টগ্রাম বন্দর কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার এবং জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি কৌশলগত অবকাঠামো।
চুক্তি স্বাক্ষর হয়ে গেছে বলেই জনগণের প্রশ্ন তোলা, প্রতিবাদ করা কিংবা সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানানোর অধিকার শেষ হয়ে যায়নি। চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্ত, আর্থিক কাঠামো, রাষ্ট্রের রাজস্ব প্রাপ্তি, পরিচালনাগত অধিকার, বিনিয়োগের কাঠামো এবং ১৫ বছর পর এর সম্ভাব্য প্রভাব জনগণের সামনে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে হবে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নিয়ে কোনো চুক্তি জনগণের জানার অধিকারের বাইরে থাকতে পারে না।
সরকার যদি দাবি করে থাকে যে আন্তর্জাতিক অপারেটরের মাধ্যমে নিউমুরিং টার্মিনালের দক্ষতা, সক্ষমতা ও আধুনিকায়ন বাড়বে, তাহলে তার সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ও কারিগরি যুক্তি জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। রাষ্ট্র নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় টার্মিনাল পরিচালনা করলে সম্ভাব্য রাজস্ব, দক্ষতা ও উন্নয়নের চিত্র কী হতে পারে এবং বিদেশি অপারেটরকে দায়িত্ব দিলে রাষ্ট্র কী সুবিধা পাবে—তার স্বচ্ছ ও তুলনামূলক মূল্যায়ন প্রকাশ করা জরুরি।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল চট্টগ্রাম বন্দরের অন্যতম ব্যস্ত কনটেইনার টার্মিনাল এবং ২০২৫ সালে বন্দরের মোট কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৪৪ শতাংশ এই টার্মিনালের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে। ফলে এর পরিচালনা কাঠামো পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের প্রভাব দেশের আমদানি-রপ্তানি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে পড়তে পারে।
চুক্তির আগে বন্দর শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো সরকারের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার দাবি জানিয়েছিল। তাদের উদ্বেগ ও আপত্তি নিয়ে অর্থবহ আলোচনা এবং সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণের আগেই চুক্তি সম্পন্ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জনগণের মতামত ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যকে যথাযথ গুরুত্ব না দিয়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত গ্রহণ গণতান্ত্রিক জবাবদিহির প্রশ্ন তৈরি করে।
“জনগণের সঙ্গে আলোচনা না করে, বন্দর শ্রমিকদের উদ্বেগের যথাযথ সমাধান না করে এবং চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্ত জনগণের সামনে পরিষ্কারভাবে প্রকাশ না করেই সরকার কীভাবে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের পরিচালনার দায়িত্ব ১৫ বছরের জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দিতে পারে? দেশের কৌশলগত অবকাঠামো নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।”
বিদেশি কোম্পানি বা আন্তর্জাতিক অপারেটরের অংশগ্রহণের প্রশ্নে সরকারের অবস্থানও জনগণের সামনে পরিষ্কার করা দরকার। বন্দরের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের হাতে থাকলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ১৫ বছরের জন্য বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়া হচ্ছে। ফলে এই দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থার অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও কৌশলগত প্রভাব নিয়ে জনসম্মুখে বিস্তারিত আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) ভবনের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচিতে পুলিশের লাঠিচার্জের ঘটনায় শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া নাগরিকদের ওপর বলপ্রয়োগের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করা হয়। জনগণ কোনো সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলতে, প্রতিবাদ করতে এবং সিদ্ধান্ত বাতিল বা পুনর্বিবেচনার দাবি জানাতে পারে। গণতান্ত্রিক মতপ্রকাশের জবাব দমন-পীড়নের মাধ্যমে দেওয়া উচিত নয়।
“চুক্তি স্বাক্ষর হয়ে গেছে বলে জনগণের প্রতিবাদ থেমে যাবে না। আর লাঠিচার্জ করে জনগণের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায় না। জনগণ জানতে চায়—কেন নিউমুরিং টার্মিনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনার পরিচালনার দায়িত্ব ১৫ বছরের জন্য বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়া হলো, রাষ্ট্র এর বিনিময়ে কী পাচ্ছে এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে। এসব প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব দিতে হবে।”
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের জনগণের সম্পদ। বন্দরের অবকাঠামো উন্নয়ন, আধুনিকায়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধির প্রয়োজন থাকলেও তার জন্য এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যাতে দেশের নিজস্ব সক্ষমতা বিকশিত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি না হয়। একই সঙ্গে বন্দর পরিচালনার ক্ষেত্রে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান, অধিকার ও নিরাপত্তার বিষয় নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে বিষয়টির রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক শেষ হয়ে যায়নি। চুক্তির পূর্ণাঙ্গ তথ্য জনগণের সামনে প্রকাশ, সংশ্লিষ্ট শ্রমিক সংগঠন, বন্দরসংশ্লিষ্ট পক্ষ, অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য গ্রহণ এবং চুক্তির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনা করার আহ্বান জানানো হয়। জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে কোনো অসঙ্গতি পাওয়া গেলে চুক্তি পুনর্বিবেচনা ও বাতিলের দাবিও জানানো হয়।
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ও ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ডের ১৫ বছরের চুক্তি বাতিল, চুক্তির পূর্ণাঙ্গ তথ্য ও শর্ত জনসম্মুখে প্রকাশ, সংশ্লিষ্ট শ্রমিক-কর্মচারী ও জনগণের সঙ্গে অর্থবহ আলোচনা এবং বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জের ঘটনার তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
একই সঙ্গে দেশের ছাত্রসমাজ, শ্রমিক, পেশাজীবী ও সচেতন নাগরিকদের চট্টগ্রাম বন্দর ও জাতীয় সম্পদ রক্ষার প্রশ্নে গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণভাবে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।