জনপ্রিয় অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চন। ১৯৯৩ সালের ২২ অক্টোবর সড়ক দুর্ঘটনায় স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চনকে হারান তিনি। স্ত্রীর এই অকালমৃত্যু তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তিনি উপলব্ধি করেন অসচেতনতা ও বিশৃঙ্খলার কারণে প্রতিদিন সড়কে কত প্রাণ ঝরে যাচ্ছে। নিজের ব্যক্তিগত বেদনাকে মানুষের জীবন বাঁচানোর শক্তিতে রূপান্তর করে স্ত্রীর মৃত্যুর মাত্র ৩৯ দিন পর, ১ ডিসেম্বর ১৯৯৩ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা)। রুপালি পর্দার চাকচিক্য ছেড়ে রাজপথে নেমে টানা তিন দশকের বেশি সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে নিঃস্বার্থভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি। তার এই নিরলস আন্দোলনের ফলেই সরকার তার স্ত্রীর মৃত্যুদিবস, অর্থাৎ ২২ অক্টোবরকে ‘জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস’ হিসাবে স্বীকৃতি দেয়। বর্তমানে অসুস্থতাজনিত কারণে তিনি লন্ডনে চিকিৎসাধীন। সেখান থেকেই তিনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ নিয়ে নানা অজানা কথা।
গণমাধ্যম: নিরাপদ সড়কের দাবিতে কয়েক দশক ধরে আন্দোলন করছেন। আন্দোলন কতটা এগিয়েছে?
ইলিয়াস কাঞ্চন : আমি মনে করি, আন্দোলন অনেক দূর এগিয়েছে, মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হয়েছে, নিরাপদ সড়ক এখন আর শুধু একটি সংগঠনের দাবি নয়, এটি এখন অনেক সংগঠনের দাবি। বিশেষ করে ২০১৮ সালের ছাত্র আন্দোলনে (নিরাপদ সড়ক চাই) দেশে যে গণজাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল সেটা এই আন্দোলনেরই ফসল। ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ এখন জাতীয় দাবিতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তন সেই তুলনায় যতটা হওয়া দরকার ছিল, ততটা হয়নি। আইন হয়েছে, নীতিমালা হয়েছে, নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু একটি নিরাপদ সড়ক শুধু আইন দিয়ে হয় না। আইন প্রয়োগ, চালকের প্রশিক্ষণ, যানবাহনের ফিটনেস, সড়কের অবকাঠামো, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সবকিছু একসঙ্গে কাজ করতে হয়। আমার কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-আমরা কতগুলো আইন করেছি সেটা নয়, আমরা সেই আইন কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করেছি।
গণমাধ্যম: আন্দোলনের শুরুতে যে পরিস্থিতি দেখেছিলেন, আজকের সড়ক কি তার চেয়ে নিরাপদ?
ইলিয়াস কাঞ্চন : কিছু ক্ষেত্রে অবশ্যই পরিবর্তন হয়েছে। মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। নিরাপদ সড়ক নিয়ে কথা বললে সাধারণ মানুষ বিষয়টি বোঝে, গণমাধ্যম বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়, শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামে, রাষ্ট্রও বিষয়টিকে নীতিগতভাবে স্বীকার করে। কিন্তু আমি পুরোপুরি সন্তুষ্ট নই। কারণ প্রতিদিন যদি একটি পরিবার সড়ক দুর্ঘটনায় তার প্রিয় মানুষকে হারায়, তাহলে শুধু কিছু উন্নতি হয়েছে বললে সেই পরিবারের কাছে তার কোনো মূল্য থাকে না।
ইলিয়াস কাঞ্চন : না। আমি কখনো এই লড়াইকে ব্যর্থ মনে করিনি। কারণ আমি বিশ্বাস করি, মানুষের জীবন রক্ষার জন্য করা কোনো আন্দোলন ব্যর্থ হতে পারে না।
গণমাধ্যম : আপনার কাছ থেকে কোনো পরামর্শ কি কোনো সরকার গ্রহণ করেছে?
ইলিয়াস কাঞ্চন : হ্যাঁ, বিভিন্ন সময়ে আমাদের দেওয়া অনেক প্রস্তাব সরকার বিবেচনায় নিয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে বাস্তবায়নও হয়েছে। বিশেষ করে বিগত বিএনপি সরকারের আমলে সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল এবং জেলা পর্যায়ে জেলা সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠন একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি বলে আমি মনে করি। পাশাপাশি আমাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বুয়েটে এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট, হাইওয়ে পুলিশ গঠন ও ট্রমা সেন্টার আমাদের প্রস্তাবের অধিকতর সাফল্য।
গণমাধ্যম: কোন কোন বিষয় সরকার গ্রহণ করলে সড়কে মৃত্যুর মিছিল কমত বলে আপনি মনে করেন?
ইলিয়াস কাঞ্চন : সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রণালয়, বিআরটিএ, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, হাইওয়ে পুলিশ, জেলা পুলিশ, স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ, ফায়ার সার্ভিস, নগর কর্তৃপক্ষ ও পরিবহণ খাতের দায়িত্ব স্পষ্ট করতে হবে। জাতীয় পর্যায়ের পরিকল্পনা জেলা, উপজেলা ও নগর পর্যায়ের বাস্তবায়ন কর্মসূচিতে রূপ নিতে হবে। কোনো ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের করণীয় ও সময়সীমা প্রকাশ করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান শনাক্তকরণ, প্রশিক্ষণ ও সামাজিক নজরদারি কাজে লাগতে পারে।
গণমাধ্যম: সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু নিয়ে দেশে সাময়িক শোক তৈরি হয়, কিন্তু কিছুদিন পর সব আগের মতো হয়ে যায়। এই সামাজিক বিস্মৃতির দায় কার?
ইলিয়াস কাঞ্চন : আমি মনে করি, দায় সবার। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যাতে দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা যায় এবং দুর্ঘটনার পর যথাযথ তদন্ত ও বিচার হয়। গণমাধ্যমের দায়িত্ব শুধু দুর্ঘটনার খবর প্রকাশ করা নয়, কেন দুর্ঘটনা হলো এবং ভবিষ্যতে কীভাবে সেটি প্রতিরোধ করা যায়, সেটিও সামনে আনা। আর সাধারণ মানুষেরও দায়িত্ব আছে। আমরা অনেক সময় নিজের সুবিধার জন্য ট্রাফিক আইন ভাঙি। কিন্তু মনে রাখতে হবে, রাস্তার একটি ভুল শুধু নিজের জীবন নয়, অন্য মানুষের জীবনও কেড়ে নিতে পারে।
গণমাধ্যম : আপনার আন্দোলনের বিরোধিতা করতে গিয়ে কেউ কি কখনো আপনাকে হুমকি দিয়েছে?
ইলিয়াস কাঞ্চন : এটা সবাই জানে, আমি কতটা প্রতিরোধ ও প্রতিহিংসার স্বীকার হয়েছি। নিরাপদ সড়কের আন্দোলন করতে গিয়ে নানা ধরনের হুমকি ও বিরোধিতার মুখে পড়েছি। ২০১২ সালে আমার ছবিতে জুতার মালা পরানো হয়েছিল, ছবি পোড়ানো হয়েছিল, এমনকি আমার গাড়িতেও আঘাত করা হয়েছিল। ২০১৮ সালেও আমাকে বাস টার্মিনালগুলোতে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়।
গণমাধ্যম : সরকারগুলো নিরাপদ সড়কের প্রতিশ্রুতি দেয়, আইনও প্রণয়ন করে। তাহলে ঘাটতি কোথায়?
ইলিয়াস কাঞ্চন : আমাদের আইন আছে। সমস্যা হচ্ছে সেই আইন কতটা নিরপেক্ষভাবে এবং নিয়মিতভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। আইন যদি শুধু সাধারণ মানুষের জন্য কঠোর হয়, কিন্তু প্রভাবশালী কেউ আইন ভাঙার পরও পার পেয়ে যায়, তাহলে মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা তৈরি হবে না। তাই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গণমাধ্যম : তদন্ত, বিচার ও ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো কতটা ন্যায়বিচার পায়?
ইলিয়াস কাঞ্চন : দুঃখজনকভাবে অনেক পরিবারই প্রত্যাশিত ন্যায়বিচার পায় না। বর্তমানে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার যে ব্যবস্থা চালু হয়েছে, আমি সেটিকে অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ হিসাবে দেখি। একটি দুর্ঘটনায় একজন মানুষ মারা গেলে তার পরিবার শুধু একজন স্বজনকেই হারায় না, অনেক সময় পরিবারের উপার্জনের প্রধান মানুষটিকেও হারায়। তাই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে রাষ্ট্রের দাঁড়ানো অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তবে ক্ষতিপূরণ দেওয়া আর পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়। ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি দুর্ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
গণমাধ্যম: নিরাপদ সড়ক নিয়ে গণমাধ্যমের ভূমিকা কি যথেষ্ট?
ইলিয়াস কাঞ্চন : গণমাধ্যম আমাদের আন্দোলনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। নিরাপদ সড়কের বিষয়টি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে সংবাদমাধ্যমের অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে আমি মনে করি, আরও বেশি অনুসন্ধানী ও ধারাবাহিক ভূমিকা দরকার।