আমরা প্রায়ই শুনি—রাগী মানুষদের মন নাকি খুব ভালো। কথাটা শুনতে সুন্দর। কিন্তু সেই ভালো মন যদি এক মুহূর্তের রাগে অন্যের মনে দাগ কেটে দেয়, তাহলে সেই ভালো মন দিয়ে আসলে কীই-বা হবে?
আমাদের আশপাশে এ ধরনের অনেক ভালো মনের মানুষ আছেন। অফিসে, বাসায়—সব জায়গায় তারা মোটামুটি স্বাভাবিক।সহকর্মীরা তাদের সাহায্যপ্রবণ বলে জানেন, বন্ধুরা বলেন—ভেতরে ‘ভালো মনের মানুষ’। কিন্তু ছোট্ট কোনো বিষয়—একটা ভুল কথা, সামান্য দেরি কিংবা তুচ্ছ মতবিরোধ—হলেই যেন তার ভেতরে অন্য এক মানুষ জেগে ওঠে।মুহূর্তের মধ্যে তার মুখ লাল হয়ে যায়, ঘামতে থাকে, কণ্ঠস্বর বদলে যায়। কখনো চিৎকার, কখনো কটু কথা—কখনো আবার এমন আচরণ, যা পরে সে নিজেই বিশ্বাস করতে পারে না।আশ্চর্যের বিষয় হলো, ঝড় থেমে গেলে সেই মানুষটাই আবার চুপচাপ হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর চোখে ভেসে ওঠে অনুশোচনা—“আমি আসলে এমন না…”
আবার কেউ কেউ তার এই রাগের পেছনে যুক্তি দেন—এটা নাকি মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতিরই অংশ।তবে প্রশ্ন হলো—রাগ কি শুধুই স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো গভীর মানসিক কারণ?
চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই দ্রুত ও তীব্র রাগের বহিঃপ্রকাশকে একটি রোগ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা ‘ইন্টারমিটেন্ট এক্সপ্লোসিভ ডিসঅর্ডার’ নামে পরিচিত।
এর সবচেয়ে বড় লক্ষণ হলো, কোনো ছোট বা সাধারণ ঘটনার তুলনায় মানুষটি অনেক বেশি রেগে যান।
অর্থাৎ, যেখানে সামান্য বিরক্ত হওয়াই স্বাভাবিক, সেখানে তিনি অস্বাভাবিকভাবে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখান—চিৎকার করেন, কটু কথা বলেন বা কখনো আক্রমণাত্মক আচরণও করেন।আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ওই ঘটনার সময় তার মেজাজ আগে থেকে খারাপ ছিল—এমন নয়। তবুও হঠাৎ করেই এমন রাগের বিস্ফোরণ ঘটে, যা তিনি নিজেও পরে ঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন না।
লেবানিজ আমেরিকান ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টারের মনোরোগ বিভাগের প্রধান জোসেলিন আজার বলেন, এই সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা সাধারণত স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন। এমনকি তীব্রভাবে রেগে যাওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্তও তারা পুরোপুরি স্বাভাবিক থাকেন।গবেষণা সংস্থা সায়েন্স ডাইরেক্ট–এর তথ্য অনুযায়ী, ১৭টি দেশের ২৯টি গবেষণায় দেখা গেছে—প্রায় ৫.১ শতাংশ মানুষ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে এই সমস্যায় ভুগতে পারেন। প্রায় ১ লাখ ৮২ হাজার মানুষের ওপর এই গবেষণা চালানো হয়েছে।
সহজভাবে বললে, এটি একটি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের স্বীকৃত তালিকায়ও অন্তর্ভুক্ত।
আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের মতে, এই সমস্যাটি নির্ণয় করা সবসময় সহজ নয়। কারণ এর লক্ষণ অনেক সময় অন্যান্য মানসিক সমস্যার সাথে মিলে যায়।
যেমন, বর্ডারলাইন পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার, বাইপোলার ডিসঅর্ডার এবং কখনো কখনো মনোযোগ ঘাটতিজনিত হাইপারঅ্যাকটিভিটি ডিসঅর্ডার বা এডিএইচডির–এর সাথেও এর মিল পাওয়া যায়।
আরেকটি বড় কারণ হলো—অনেকেই এই ধরনের রাগকে গুরুত্ব দেন না। চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে এটাকে ‘স্বভাব’ বলেই এড়িয়ে যান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাগ আসলে একটি নেতিবাচক আবেগ, যা হতাশা, আঘাত বা হুমকির অনুভূতি থেকে তৈরি হতে পারে—তা বাস্তব হোক বা কল্পিত।
ড. আজারের মতে, এই সমস্যাটি খুব বেশি পরিচিত না হলেও বেশ সাধারণ। তিনি জানান, রাগের এই বিস্ফোরণ সাধারণত ১৫ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যে কমে যায়। এরপর অনেকেই শান্ত হয়ে যান এবং নিজের আচরণের জন্য অনুশোচনা করেন। তবে এই অপরাধবোধ ভবিষ্যতে একই আচরণ থেকে সবসময় বিরত রাখতে পারে না।
এই এক্সপ্লোসিভ ডিসঅর্ডার সংক্রান্ত গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো শৈশবের ট্রমা, শোষণ এবং শারীরিক নির্যাতন, বুলির শিকার হওয়াও এই রাগ বা ক্রোধের কারণ।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের নির্দেশিকা অনুযায়ী, যদি টানা তিন মাস ধরে প্রতি সপ্তাহে অন্তত দুইবার এমন রাগের বিস্ফোরণ ঘটে, অথবা এক বছরে অন্তত তিনবার গুরুতর আক্রমণ দেখা যায়, তাহলে সেটিকে সমস্যার লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়।
এই সমস্যার পেছনে জৈবিক, সামাজিক ও পারিবারিক—সব ধরনের কারণই থাকতে পারে। শৈশবের ট্রমা, নির্যাতন, বুলিং কিংবা অস্থির পারিবারিক পরিবেশ—এসবও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গবেষণায় আরো দেখা গেছে, মাদক ও অ্যালকোহল এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
আমাদের মস্তিষ্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অ্যামিগডালা, যা আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে, এই ক্ষেত্রে বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। একইসাথে সেরোটোনিন–এর ভারসাম্যহীনতাও আক্রমণাত্মক আচরণের সাথে জড়িত।
ঘন ঘন রাগের বহিঃপ্রকাশ শুধু মানসিক নয়, শারীরিক সমস্যাও তৈরি করতে পারে—যেমন স্ট্রোক, হৃদরোগ বা ডায়াবেটিসের ঝুঁকি।
এছাড়া এই সমস্যা একজন মানুষের সম্পর্ককেও গভীরভাবে প্রভাবিত করে। দ্রুত রেগে যাওয়া মানুষের কাছ থেকে অন্যরা ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়—সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন পরিবারের সদস্যরাই।
ড. আজার বলেন, যখন রাগ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন ব্যক্তি আর নিজের আবেগ সামলাতে পারেন না।
কোন পরিস্থিতিতে একজন ব্যক্তির রাগের উদ্রেক হয় সেটি বোঝা গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবারের ভূমিকা
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবারের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা রাগের ধরন ও মাত্রা পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।
এই ধরনের ব্যক্তিরা সহজেই বিরক্ত হন এবং বাধা সহ্য করতে পারেন না। এমনকি “শান্ত হও” বললেও তারা আরো বিরক্ত হতে পারেন।
তাই করণীয়—
তাকে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে দেওয়া
রাগের কারণ চিহ্নিত করা
অযথা দোষারোপ না করা
নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত রাখা
প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া
চিকিৎসা কী?
এই সমস্যার চিকিৎসা সম্ভব।
সাধারণত ব্যবহৃত পদ্ধতিগুলো হলো—
কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি
রিলাক্সেশন ও ব্রিদিং টেকনিক
ট্রিগার এড়িয়ে চলা
প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ—যেমন অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট বা মুড স্ট্যাবিলাইজার—ব্যবহার করা হয়।
ড. আজারের মতে, প্রয়োজন হলে চিকিৎসা নিতে দ্বিধা করা উচিত নয়—কারণ নিয়ন্ত্রণহীন রাগ শুধু একজন মানুষকে নয়, তার চারপাশের সবাইকেই প্রভাবিত করে।