মানুষ জন্মগতভাবেই চাহিদার সত্তা। তার হৃদয়ে থাকে প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা, নিরাপত্তার তৃষ্ণা, সচ্ছলতার স্বপ্ন। সে দিনরাত পরিশ্রম করে, দৌড়ায় রুজির পেছনে, উদ্বিগ্ন থাকে ভবিষ্যতের নিশ্চয়তার জন্য। কিন্তু এই ব্যস্ততার ভেতর একটি মৌলিক প্রশ্ন প্রায়ই হারিয়ে যায় যে, প্রাচুর্যের উৎস কোথায়? অন্তরের শান্তি কি উপার্জনের পরিমাণে, নাকি সম্পর্কের দৃঢ়তায়? নাকি তা নির্ভর করে সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতার ওপর?দুনিয়ার হিসাব আমাদের শেখায়, যত বেশি কাজ তত বেশি আয়, যত বেশি দৌড় তত বেশি সাফল্য।অথচ ওহির শিক্ষা এক ভিন্ন সত্য তুলে ধরে। সেখানে বলা হয়, মানুষের প্রকৃত অভাব বাইরের নয়, ভেতরের। অন্তর যদি শূন্য থাকে, তবে সম্পদের পাহাড়ও তাকে তৃপ্ত করতে পারে না। আর অন্তর যদি আল্লাহর স্মরণে পরিপূর্ণ হয়, তবে অল্পেও সে তৃপ্ত ও প্রশান্ত থাকে।এই বাস্তবতাকে অত্যন্ত গভীর ও মর্মস্পর্শী ভাষায় তুলে ধরেছে একটি কুদসি হাদিস, যেখানে মহান আল্লাহ নিজেই বান্দাকে সম্বোধন করে জীবনের অগ্রাধিকার ঠিক করে দিচ্ছেন।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ “ إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يَقُولُ يَا ابْنَ آدَمَ تَفَرَّغْ لِعِبَادَتِي أَمْلأْ صَدْرَكَ غِنًى وَأَسُدَّ فَقْرَكَ وَإِلاَّ تَفْعَلْ مَلأْتُ يَدَيْكَ شُغْلاً وَلَمْ أَسُدَّ فَقْرَكَ ” .
আবু হুরাইরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেন, হে আদমসন্তান! তুমি আমার ইবাদতের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করো, আমি তোমার অন্তরকে ঐশ্বর্যে পূর্ণ করে দেব এবং তোমার অভাব দূর করে দেব। তুমি তা না করলে আমি তোমার দুই হাত কর্মব্যস্ততায় পরিপূর্ণ করে দেব এবং তোমার অভাব-অনটন রহিত করব না। (তিরমিজি, হাদিস : ২৪৬৬)
এই হাদিসটি একটি কুদসি হাদিস।অর্থাৎ এর ভাষ্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের, কিন্তু বক্তব্য আল্লাহ তাআলার। এখানে মানুষের জীবনদর্শন, কর্মব্যস্ততা, রিজিক ও অন্তরের স্বস্তি; সব কিছুর মূলনীতি খুব সংক্ষিপ্ত অথচ গভীরভাবে তুলে ধরা হয়েছে।আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে আদম সন্তান! তুমি আমার ইবাদতের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করো…” এখানে ইবাদত বলতে শুধু নামাজ, রোজা বা কিছু নির্দিষ্ট আচার বোঝানো হয়নি। বরং জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে রাখা বোঝানো হয়েছে। মানুষ যেন তার সময়, শক্তি ও মনোযোগের বড় অংশ আল্লাহর স্মরণ, আনুগত্য ও বিধান মানার দিকে দেয়।দুনিয়ার কাজ করবে, রিজিকের চেষ্টা করবে; কিন্তু তা যেন উদ্দেশ্য না হয়ে উপায় হয়।এর বিনিময়ে আল্লাহ যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেছেন “আমি তোমার অন্তরকে ঐশ্বর্যে পূর্ণ করে দেব এবং তোমার অভাব দূর করে দেব।” এখানে ঐশ্বর্য মানে কেবল ধনসম্পদ নয়; বরং অন্তরের তৃপ্তি। অনেকের প্রচুর সম্পদ আছে, তবু অশান্তি তার পিছু ছাড়ে না। আবার কেউ অল্প আয়ে জীবনযাপন করেও শান্ত ও পরিতৃপ্ত। এই তৃপ্তিই আসল ঐশ্বর্য। অন্য এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “ধন-সম্পদ বেশি থাকার নাম ধনী হওয়া নয়; প্রকৃত ধনী হলো যার অন্তর ধনী।” (বুখারি, হাদিস: ৬৪৪৬)এরপর আল্লাহ সতর্ক করেছেন, “তুমি তা না করলে আমি তোমার দুই হাত কর্মব্যস্ততায় পরিপূর্ণ করে দেব এবং তোমার অভাব-অনটন রহিত করব না।” অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহর ইবাদাত ও আনুগত্যকে উপেক্ষা করে শুধু দুনিয়ার পেছনে ছুটবে, তার জীবন হবে নিরন্তর ব্যস্ততায় ভরা। সে হয়তো সারাদিন কাজ করবে, হিসাব করবে, পরিকল্পনা করবে; কিন্তু তবুও অভাবের অনুভূতি যাবে না। চাহিদা বাড়তেই থাকবে, দুশ্চিন্তা কমবে না। বাহ্যিকভাবে সে সফল মনে হলেও অন্তরে থাকবে শূন্যতা।ইমাম ইবনু রাজব (রহ.) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, বান্দা যখন আল্লাহর অধিকারে অগ্রাধিকার দেয়, আল্লাহ তার দুনিয়াবি প্রয়োজনের দায়িত্ব নিজের কৃপায় সহজ করে দেন। কিন্তু যখন বান্দা দুনিয়াকে অগ্রাধিকার দেয়, তখন তাকে সেই দুনিয়ার ভেতরেই ক্লান্ত ও বিভ্রান্ত করে রাখা হয়।এই হাদিস আমাদের শেখায়, জীবনযুদ্ধ থেকে পালানো নয়; বরং অগ্রাধিকার ঠিক করা জরুরি। রিজিকের মালিক আল্লাহ। তাই তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক থাকলে দুনিয়ার বোঝাও হালকা হয়। আর সম্পর্ক ছিন্ন হলে দুনিয়ার ব্যস্ততা কখনোই পরিপূর্ণতা দেয় না।সংক্ষেপে, এ হাদিস মানুষের সামনে দুটি পথ খুলে দেয়—একটি ইবাদাতকেন্দ্রিক জীবন, যা অন্তরের প্রশান্তি ও প্রকৃত সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যায়; অন্যটি শুধু দুনিয়ামুখী জীবন, যা অবিরাম ব্যস্ততা ও অশান্তির দিকে ঠেলে দেয়। সিদ্ধান্ত মানুষের, ফল নির্ধারিত।
এ ক্যাটাগরির আরো নিউজ..