মানুষের পার্থিব জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু মৃত্যুর পরের জীবনই চিরস্থায়ী ও প্রকৃত বাস্তবতা। মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সামনে শুরু হয় আখিরাতের প্রথম ধাপ কবরের জীবন বা বরজাখ। সেখানে মানুষের ঈমান, আমল এবং দুনিয়ায় তার বিশ্বাসের সত্যতা পরীক্ষা করা হবে। কবর শুধু একটি মাটির গর্ত নয়; এটি কারো জন্য জান্নাতের বাগানসম, আবার কারো জন্য জাহান্নামের গর্তসম হয়ে উঠতে পারে।
কবরের এই বাস্তবতা ও সেখানে মানুষের অবস্থা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন হাদিসে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। নিম্নে এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস বর্ণিত হলো-
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ أَنَّهُ حَدَّثَهُمْ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ إِنَّ الْعَبْدَ إِذَا وُضِعَ فِي قَبْرِهِ وَتَوَلَّى عَنْهُ أَصْحَابُهُ وَإِنَّهُ لَيَسْمَعُ قَرْعَ نِعَالِهِمْ أَتَاهُ مَلَكَانِ فَيُقْعِدَانِهِ فَيَقُولاَنِ مَا كُنْتَ تَقُولُ فِي هَذَا الرَّجُلِ لِمُحَمَّدٍ فَأَمَّا الْمُؤْمِنُ فَيَقُولُ أَشْهَدُ أَنَّهُ عَبْدُ اللهِ وَرَسُولُهُ فَيُقَالُ لَهُ انْظُرْ إِلَى مَقْعَدِكَ مِنْ النَّارِ قَدْ أَبْدَلَكَ اللهُ بِهِ مَقْعَدًا مِنْ الْجَنَّةِ فَيَرَاهُمَا جَمِيعًا قَالَ قَتَادَةُ وَذُكِرَ لَنَا أَنَّهُ يُفْسَحُ لَهُ فِي قَبْرِهِ ثُمَّ رَجَعَ إِلَى حَدِيثِ أَنَسٍ قَالَ وَأَمَّا الْمُنَافِقُ وَالْكَافِرُ فَيُقَالُ لَهُ مَا كُنْتَ تَقُولُ فِي هَذَا الرَّجُلِ فَيَقُولُ لاَ أَدْرِي كُنْتُ أَقُولُ مَا يَقُولُ النَّاسُ فَيُقَالُ لاَ دَرَيْتَ وَلاَ تَلَيْتَ وَيُضْرَبُ بِمَطَارِقَ مِنْ حَدِيدٍ ضَرْبَةً فَيَصِيحُ صَيْحَةً يَسْمَعُهَا مَنْ يَلِيهِ غَيْرَ الثَّقَلَيْنِ
আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত যে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, বান্দাকে যখন তার কবরে রাখা হয় এবং তার সাথিরা এতটুকু মাত্র দূরে যায় যে, সে তখনো তাদের জুতার আওয়াজ শুনতে পায়। এ সময় দুজন ফেরেশতা তার কাছে এসে তাকে বসান এবং তাঁরা বলেন, এ ব্যক্তি— অর্থাৎ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে তুমি কী বলতে? তখন মুমিন ব্যক্তি বলবে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি আল্লাহ্র বান্দা এবং তাঁর রাসুল। তখন তাঁকে বলা হবে, জাহান্নামে তোমার অবস্থানস্থলটির দিকে নজর করো, আল্লাহ্ তোমাকে তার বদলে জান্নাতের একটি অবস্থানস্থল দান করেছেন।
তখন সে দুটি স্থলের দিকেই তাকিয়ে দেখবে। কাতাদাহ (রহ.) বলেন, আমাদের কাছে বর্ণনা করা হয়েছে যে, সে ব্যক্তির জন্য তাঁর কবর প্রশস্ত করে দেওয়া হবে। অতঃপর তিনি (কাতাদাহ) পুনরায় আনাস (রা.)-এর হাদিসের বর্ণনায় ফিরে আসেন। তিনি [(আনাস) (রা.)] বলেন, আর মুনাফিক বা কাফির ব্যক্তিকেও প্রশ্ন করা হবে— তুমি এ ব্যক্তি (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সম্পর্কে কী বলতে? সে উত্তরে বলবে, আমি জানি না।
লোকেরা যা বলত আমি তা-ই বলতাম। তখন তাকে বলা হবে, তুমি না নিজে জেনেছ, না তিলাওয়াত করে শিখেছ। আর তাকে লোহার মুগুর দ্বারা এমনভাবে আঘাত করা হবে, যার ফলে সে এমন বিকট চিৎকার করে উঠবে যে দুই জাতি (মানুষ ও জিন) ছাড়া তার আশপাশের সবাই তা শুনতে পাবে। (বুখারি, হাদিস : ১৩৭৪)
এই হাদিস কবরের প্রশ্ন ও মানুষের পরিণতির একটি জীবন্ত চিত্র তুলে ধরে। এখানে স্পষ্ট করা হয়েছে যে কবরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি বিশ্বাস সম্পর্কে।অর্থাৎ প্রকৃত ঈমান শুধু মুখের কথা নয়; এটি হৃদয়ের বিশ্বাস, জ্ঞান ও আমলের সমন্বয়। যে ব্যক্তি দুনিয়ায় সত্যকে জেনে, বুঝে এবং মেনে চলেছে, সে কবরের পরীক্ষায় সফল হবে। তার জন্য কবর প্রশস্ত করা হবে এবং জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া হবে।
অন্যদিকে মুনাফিক বা অবিশ্বাসীর অবস্থা হবে ভিন্ন। তারা দুনিয়ায় সত্যকে জানার চেষ্টা করেনি, শুধু লোকদেখানো বা অন্ধ অনুকরণে জীবন কাটিয়েছে। তাই কবরের প্রশ্নের উত্তরে তারা অসহায় হয়ে পড়বে। এই হাদিস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, ঈমানকে গভীরভাবে জানা, কোরআন-সুন্নাহ অধ্যয়ন করা এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন গঠন করা অত্যন্ত জরুরি।
এ হাদিস মানুষের অন্তরে আখিরাতের জবাবদিহির অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। দুনিয়ার জীবন আসলে কবর ও আখিরাতের প্রস্তুতির ক্ষেত্র। তাই প্রতিটি মুমিনের উচিত নিজের ঈমানকে শুদ্ধ করা, ইলম অর্জন করা এবং এমন আমল করা, যা তাকে কবরের কঠিন পরীক্ষায় সফলতা এনে দেবে।
এ ক্যাটাগরির আরো নিউজ..