কেন্দুয়া (নেত্রকোণা) প্রতিনিধি:
নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলায় বাবার হেবা দলিল করা জমি দীর্ঘ ১৩ বছর পর দখলে নিয়েছেন অসহায় নারী আকলিমা আক্তার আঁখি। সোমবার (৩১ আগস্ট) উপজেলার ৯ নম্বর নওপাড়া ইউনিয়নের পোড়াবাড়ি গ্রামের পেছনে পুকুরিয়া হাওরে গিয়ে দেখা যায়, জমিতে লাল নিশান টাঙিয়ে ইঞ্জিনচালিত হাল দিয়ে জমি চাষ করা হচ্ছে এবং আমন ধানের চারা রোপণের প্রস্তুতি চলছে।
আকলিমা আক্তার আঁখি উপজেলার নওপাড়া ইউনিয়নের পোড়াবাড়ি গ্রামের মৃত আলী হোসেন ফকিরের মেয়ে। তাঁর স্বামীর বাড়ি পাশের মদন উপজেলায়। আলী হোসেন ফকিরের চার ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলেরা হলেন—নুরু মিয়া, কাঞ্চন মিয়া, দনাই মিয়া ও আবদুল কাদির। একমাত্র মেয়ে আকলিমা আক্তার আঁখি।
স্থানীয় সূত্র ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আলী হোসেন ফকির ওরফে আনছু মিয়া ছিলেন গ্রামের মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। জীবনের অধিকাংশ সময় কৃষিকাজ করে তিনি ধীরে ধীরে বেশ কিছু সম্পত্তির মালিক হন। তাঁর স্ত্রী সুন্দরবানু মারা যাওয়ার পর সন্তানদের মধ্যে সম্পত্তি ভাগ-বাঁটোয়ারা করে দেন। এ সময় তাঁর কয়েকজন ছেলেকে কিছু জমি হেবা দলিলও করে দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে ২০১৩ সালের ৩১ জুলাই আলী হোসেন ফকির ওরফে আনছু মিয়া তাঁর বড় ছেলে নুরু মিয়া, মেজো ছেলে দনাই মিয়া ও ছেলে কাঞ্চন মিয়াকে সঙ্গে নিয়ে কেন্দুয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে মেয়ের নামে জমি হেবা দলিল করেন বলে পারিবারিক সূত্রে জানা যায়। লেখক সুলতান উদ্দিনের মাধ্যমে ৩৯২ নম্বর সনদে বিভিন্ন দাগের জমি ওই হেবা দলিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। জমিগুলোর মধ্যে ৩২৯৫ দাগে ১৬ শতাংশ, ৬৫২ দাগে ৬৬ শতাংশ, ৬৫৩ দাগে ৪৭ শতাংশ, ৮৯১ দাগে ১০ শতাংশ, ১০২৭ দাগে ১৬.৪৩ শতাংশ, ৯৭৭ দাগে ১৫ শতাংশ, ৯৬৩ দাগে ৪ শতাংশ, ৯৮৪ দাগে ২১ শতাংশ, ৯৮৭ দাগে ১০ শতাংশ, ৯৮৮ দাগে ১০ শতাংশ, ৮৪১ দাগে ৩২ শতাংশ এবং ১৯৮৪ দাগে ৯৮ শতাংশ জমির উল্লেখ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট খতিয়ান নম্বর ২২৩১, ১৯০১, ১৯৬১ ও ১৯৪৭ বলে জানা গেছে।
তবে পরবর্তীতে ২০১৫ সালের ৯ জুন আলী হোসেন ফকিরের তৃতীয় ছেলে মো. কাঞ্চন মিয়া বাবার কাছ থেকে আরও কিছু জমিসহ মোট ৯৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ জমি হেবা দলিল করে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিবারের অন্য সদস্যরা বিষয়টি জানতেন না বলেও দাবি করা হয়েছে।
আকলিমা আক্তার আঁখির অভিযোগ, বাবার কাছ থেকে পাওয়া জমির কিছু অংশ তিনি ভোগদখল করার পর তাঁর তৃতীয় ভাই কাঞ্চন মিয়া বাকি জমি চাষাবাদ করার দায়িত্ব নেন। ফসলের অর্ধেক বোনকে দেওয়ার এবং তাঁকে দেখভাল করার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি। কিন্তু দীর্ঘ প্রায় ১৩ বছর ধরে জমিতে চাষাবাদ করলেও কাঞ্চন মিয়া তাঁকে কোনো ফসলের অংশ দেননি।
আকলিমা আক্তার বলেন, “অনেকদিন ধরে ভাইয়ের কাছে আমার জমি ও ফসলের হিস্যা চেয়ে আসছি। এর আগে ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থানায় অভিযোগও দিয়েছিলাম। তখন আমার ভাই কাঞ্চন মিয়া বিষয়টি সমাধানের কথা বলেছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সুরাহা হয়নি। তাই বাধ্য হয়ে নিজেই সন্তানদের নিয়ে জমিতে এসেছি।”
তিনি আরও বলেন, “এতদিন ভয়ভীতি দেখিয়ে আমাকে জমিতে যেতে দেওয়া হয়নি। এখন আর ভয় পাই না। কেউ বাধা দিলে এই জমিতেই মরব, তবুও জমি থেকে সরে যাব না।”
আকলিমার ছোট ভাই আবদুল কাদির বলেন, “আকলিমা আমার একমাত্র বোন। বাবা তাকে বিয়ে দেওয়ার পর আদর করে কিছু জমি হেবা দলিল করে দিয়েছিলেন। কিন্তু সে সেই জমি ভোগ করতে পারছে না। আজ বোনকে সন্তানদের নিয়ে নিজে জমিতে হাল চাষ করতে দেখে আমি খুশি হয়েছি।”
জানা গেছে, জমি দখল ও নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কায় আকলিমা আক্তার আঁখি ৩১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে কেন্দুয়া থানায় একটি অভিযোগ দিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে কাঞ্চন মিয়ার বক্তব্য জানতে তার বাড়িতে না পেয়ে মুঠোফোনে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ না করায় বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। স্থানীয়ভাবে বিষয়টি নিয়ে পারিবারিক বিরোধ দীর্ঘদিনের বলে জানা গেছে। জমির প্রকৃত মালিকানা ও হেবা দলিলের বৈধতা নিয়ে কোনো আইনি বিরোধ রয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট দলিল ও ভূমি রেকর্ড যাচাই সাপেক্ষে নিশ্চিত হওয়া যাবে।