কেরালার প্রবাসী সমাজে এই রীতি কতটা পুরনো, তারও রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। ১৯৬০-এর দশক থেকেই গালফে কাজ করা কেরালার অভিবাসীদের মধ্যে দেশে জিনিসপত্র পাঠানোর জন্য এ ধরনের কার্টন ব্যবহারের প্রচলন ছিল বলে জানানো হয়েছে।
তখন বিদেশি পণ্য স্থানীয় বাজারে সহজে পাওয়া যেত না। ফলে বিদেশ থেকে আনা সাবান, তেল, চকলেট কিংবা দুধের গুঁড়া পরিবারের কাছে হয়ে উঠত বিশেষ উপহার। সময়ের সঙ্গে এসব পণ্য ভারতের বাজারেও সহজলভ্য হয়েছে। অনলাইনেও পাওয়া যায়। তারপরও ঐতিহ্যটি হারিয়ে যায়নি।
কারণ এসব পণ্যের মূল্য শুধু দামের হিসাবে মাপা যায় না। প্রবাসে বছরের পর বছর কাজ করা একজন মানুষের কাছে পরিবারের জন্য নিজের হাতে কেনা ছোট্ট একটি সাবানও হয়ে উঠতে পারে ভালোবাসার প্রতীক।
কেরালার প্রবাসীদের ছুটির আগের রাতও অনেক সময় এই বাক্স ঘিরেই কাটে। সহকর্মীরা মিলে প্যাকিংয়ে সাহায্য করেন। কেউ বাক্সে জিনিস সাজান, কেউ টেপ দিয়ে মুড়িয়ে দেন, আবার কেউ লিখে দেন যাত্রীর নাম ও গন্তব্য। পাশাপাশি চলে রান্নাবান্না, আড্ডা ও আনন্দ-উৎসব।
দেশে পৌঁছানোর পর শুরু হয় আরেক আনন্দ। পরিবারের সদস্যদের সামনে খুলে ফেলা হয় সেই বাক্স। একে একে বেরিয়ে আসে চকলেট, সাবান, পারফিউম, টাইগার বাম কিংবা নানা ছোটখাটো উপহার। প্রতিটি জিনিসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দূরদেশে থাকা প্রিয় মানুষের কথা।
ছুটি শেষে আবার যখন প্রবাসে ফিরতে হয়, তখন অনেক সময় সেই একই বাক্স বা ব্যাগে উঠে আসে বাড়ির জিনিস। শুকনো মাছ, নারকেল, কলার চিপসসহ নানা খাবার নিয়ে ফেরেন তারা। অর্থাৎ বাক্সটি শুধু একদিকে ভালোবাসা বহন করে না, এটি দুই প্রান্তের পরিবারের মধ্যে সম্পর্কও ধরে রাখে।
গালফের ঝকঝকে শহর আর ব্যস্ত কর্মজীবনের আড়ালে তাই এই বাদামি বাক্সগুলোর গল্প অনেক গভীর। এগুলোতে থাকে একজন প্রবাসীর পরিশ্রম, পরিবারের জন্য তার স্বপ্ন এবং দীর্ঘ অপেক্ষার পর প্রিয়জনের কাছে ফেরার আনন্দ।
বিমানবন্দরের ব্যাগেজ বেল্টে স্যুটকেসের পাশে পড়ে থাকা সাধারণ বাদামি কার্টনগুলো তাই অনেকের কাছে শুধুই একটি বাক্স নয়—এগুলো দূরদেশে থাকা মানুষ আর ঘরে অপেক্ষা করা পরিবারের মধ্যে ভালোবাসার এক ছোট্ট সেতু।