প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য মালয়েশিয়া ও চীন। বর্তমান আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চলমান এই সফরের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বহুমাত্রিক। নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর এই সফর স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে– বাংলাদেশ তার ঐতিহ্যবাহী একরৈখিক পররাষ্ট্রনীতি থেকে বের হয়ে এখন একটি বহুমাত্রিক ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির পথে হাঁটতে শুরু করেছে। বিশেষ করে বড় ধরনের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ সামনে রেখে এই সরকারের যাত্রা শুরু হওয়ায় এবারের সফরের পরতে পরতে জড়িয়ে ছিল ভূ-রাজনীতি ও অর্থনীতির এক নতুন সমীকরণ।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের শুরুটা হয়েছিল মালয়েশিয়া দিয়ে। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা শ্রমবাজারের জট খোলা এবং রেমিট্যান্সের গতি সচল করার জন্য সফরটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ছিল। তবে মালয়েশিয়া হয়ে চীনের দিকে পা বাড়ানো কেবল দুটি দেশের সফর নয়, বরং এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের একটি নতুন স্ট্র্যাটেজিক বা কৌশলগত অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়। বাংলাদেশ এখন আসিয়ানের মতো প্রভাবশালী জোটের সঙ্গে যে কোনো ফর্মে যুক্ত হতে আগ্রহী। যদিও এই মুহূর্তে রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ বাংলাদেশের জন্য খুব বেশি লাভজনক নাও হতে পারে; তবুও প্রযুক্তি স্থানান্তর, শ্রমবাজার এবং শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের একটি বড় সম্ভাবনার দুয়ার।
তবে এই সফরের মূল আকর্ষণ ছিল চীন। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে যদি মূল্যায়ন করতে হয়, তবে এটিকে কেবল একটি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বললে ভুল হবে। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে চীন যেমন ‘অল-ওয়েদার ফ্রেন্ড’ বা সব ঋতুর বন্ধু; বাংলাদেশের জন্য চীন ঠিক তেমনি একটি ‘টাইম-টেস্টেড ফ্রেন্ড’ বা সময়-পরীক্ষিত বন্ধু। ১৯৭৫ সাল থেকে শুরু হওয়া এই সম্পর্কের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ঢাকায় যখনই যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কের উষ্ণতায় কোনো কমতি হয়নি। চীনের একটি বড় গুণ হলো তাদের ধৈর্য। বিগত সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি বিশেষ ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার পরও চীন কখনোই বাংলাদেশের হাত ছেড়ে যায়নি, যা তাদের ধারাবাহিক ও পরিপক্ব কূটনীতির পরিচয় বহন করে।
বর্তমান বাস্তবতায় চীনের কাছ থেকে বাংলাদেশের অনেক কিছু পাওয়ার আছে এবং তার বেশির ভাগই অর্থনৈতিক। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীদের তালিকা দেখলেই বোঝা যায়, এই সফরে অর্থনীতি কতটা প্রাধান্য পেয়েছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এবং অর্থনীতিবিদ তথা প্রধানমন্ত্রীর অর্থবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের এই সফরে থাকা প্রমাণ করে– বাংলাদেশ চীনের সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর জোর দিচ্ছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে চীনে তাদের প্রথম বৈদেশিক অফিস খোলার ঘোষণা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘সামার ডাভোস’খ্যাত ডালিয়ান সম্মেলনে অংশ নিয়ে বেইজিংয়ে বাংলাদেশের বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের কথা তুলে ধরেছেন।
বর্তমানে আমেরিকার ট্যারিফ বা শুল্কনীতির কারণে চীন বাধ্য হয়ে তাদের অনেক কলকারখানা ও ব্যবসা তৃতীয় কোনো দেশে সরিয়ে নিতে চাচ্ছে। বাংলাদেশ যদি একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে, তবে সুযোগটি কাজে লাগিয়ে বড় ধরনের চীনা বিনিয়োগ দেশে আনা সম্ভব। তবে এখানে মনে রাখা দরকার, বাংলাদেশ চীনের কাছে কোনো দান-খয়রাত বা চ্যারিটি চাচ্ছে না। বাংলাদেশ চায় একটি ‘উইন-উইন’ বা দ্বিপক্ষীয় লাভজনক পরিস্থিতি, যেখানে চীন ব্যবসা করবে, বিনিয়োগ করবে এবং লভ্যাংশ নিয়ে যাবে। বাংলাদেশ পাবে উন্নত প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থান।
প্রযুক্তি স্থানান্তরের ক্ষেত্রে চীন এখন সোলার এনার্জি, উইন্ড এনার্জি এবং ইলেকট্রিক ভেহিক্যালে পৃথিবীর নেতৃত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে এই প্রযুক্তিগুলো দেশে নিয়ে আসতে পারে। এ ছাড়া বন্দর ব্যবস্থাপনায় চীনের কারিগরি দক্ষতা বা ‘নো-হাউ’ আমাদের বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পে কাজে লাগতে পারে। তবে প্রযুক্তি স্থানান্তরের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো দক্ষ জনবলের অভাব। বাংলাদেশের যে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যাগত সুবিধা রয়েছে, তা কিন্তু চিরকাল থাকবে না। চীন যদি আমাদের কারিগরি শিক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং হিউম্যান ক্যাপিটাল বা মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ করে, তবে তা পরোক্ষভাবে তাদেরই বিনিয়োগকে সফল করতে সাহায্য করবে।
সামরিক খাতের সহযোগিতার ক্ষেত্রেও একটি সূক্ষ্ম পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ চীনের সামরিক সরঞ্জামের ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। কিন্তু আমেরিকার সঙ্গে সাম্প্রতিক বাণিজ্যিক চুক্তির পর এক ধরনের সংবেদনশীলতা তৈরি হয়েছে। যার ফলে সামরিক খাতে চীনের ওপর একক নির্ভরশীলতা ধীরে ধীরে কমিয়ে এনে ডাইভারসিফাই বা বৈচিত্র্য আনার একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তবে ড্রোন প্রযুক্তির মতো যেসব অসংবেদনশীল ক্ষেত্র রয়েছে, সেখানে চীনের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে কাজ করার সুযোগ এখনও রয়েছে। এ ছাড়া তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের মতো বড় বড় টেকনিক্যাল প্রকল্পে চীনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আমাদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন।
অবশ্য চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার ক্ষেত্রে ভারতের সংবেদনশীলতাকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এই আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য বাংলাদেশকে ‘ডিকাপলিং’ বা সম্পর্কের পৃথককরণ নীতি অবলম্বন করতে হবে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে সম্পূর্ণ আলাদা চোখে দেখতে হবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে দিল্লিকে এই পরিষ্কার বার্তা বা ‘স্ট্র্যাটেজিক অ্যাশিউরেন্স’ তথা কৌশলগত আশ্বাস দিতে হবে– বাংলাদেশের ভূখণ্ড বা কোনো কার্যক্রম কখনোই ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে না। ভারতের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ইচ্ছা বা সক্ষমতা কোনোটিই বাংলাদেশের নেই– এই ভরসার জায়গাটি তৈরি করতে পারলে তিস্তা বা অন্যান্য মেগা প্রজেক্টে চীনের নো-হাউ বা কারিগরি সাহায্য নেওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের যে ঐতিহাসিক উদ্বেগ রয়েছে, তা অনেকটাই প্রশমিত হবে।
পরিশেষে বলা যায়, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় সবাই চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে যুক্ত হতে চায়। অস্ট্রেলিয়ার মতো কোয়াড বা অকাসের সদস্য দেশগুলোও চীনের সঙ্গে জোরালোভাবে যুক্ত এবং বিপুল বাণিজ্য করছে। বাংলাদেশকেও তার ঋণের সক্ষমতা ও পরিশোধের হিসাবনিকাশ ঠিক রেখে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চীনের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই চীন সফর অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের পাশাপাশি বাংলাদেশের স্বাধীন ও বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতির এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করুক, এটিই প্রত্যাশা।