বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো—নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এখন কোন পথে হাঁটবে?
আর তার চেয়েও বড় প্রশ্ন—দলের সাধারণ নেতাকর্মীরা কি অতীতের মতোই বিদেশে অবস্থানরত নেতৃত্বের নির্দেশ, আশ্বাস ও রাজনৈতিক কৌশলের বোঝা নিজেদের কাঁধে তুলে নেবেন?
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দীর্ঘ নির্বাসিত জীবনের বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত ছবি ও ভিডিওতে যে জীবনযাপনের চিত্র দেখা গেছে, সেখানে বিলাসিতা বা প্রকাশ্য ভোগের চেয়ে বরং দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, চাপ ও অপেক্ষার ছাপই বেশি চোখে পড়ে। তাঁর পোশাক-পরিচ্ছদ কিংবা দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিসপত্রেও মধ্যবিত্তসুলভ সরলতার ছবি অনেকবার দেখা গেছে। অনলাইন বৈঠক ও রাজনৈতিক বক্তব্যেও তাঁকে সাধারণত সংযত ও গম্ভীর অবস্থানে দেখা গেছে।
একই সময়ে বিএনপির বহু নেতাকর্মীও দীর্ঘদিন নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে রাজনীতি করেছেন—মামলা, কারাবরণ, আত্মগোপন, আর্থিক সংকট কিংবা জীবিকার জন্য নানা পেশায় যুক্ত হওয়ার মতো বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন। এসব ত্যাগের রাজনৈতিক মূল্য কতটা, ইতিহাসই তার বিচার করবে। তবে এটুকু সত্য—কোনো রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যৎ শুধু তার শীর্ষ নেতৃত্ব দিয়ে তৈরি হয় না; মাঠের কর্মীদের ত্যাগ, বিশ্বাস ও রাজনৈতিক সচেতনতার ওপরও দলের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক প্রশ্ন সামনে এনেছে। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের বহু শীর্ষ নেতার দেশত্যাগের পর দলের মাঠপর্যায়ের কর্মীদের একটি অংশ কার্যত নেতৃত্বশূন্য অবস্থায় পড়ে গেছে। বিদেশে থাকা নেতাদের রাজনৈতিক অবস্থান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বক্তব্য কিংবা বিভিন্ন নির্দেশনা অনুসরণ করে দেশে থাকা কর্মীরা যখন ঝুঁকিপূর্ণ কর্মসূচিতে অংশ নেন, তখন প্রশ্ন ওঠে—ঝুঁকিটা আসলে কে নিচ্ছে?
মাঠে নামছেন সাধারণ কর্মীরা।
মামলা হলে তাঁদের নাম আসছে।
গ্রেপ্তার হলে তাঁরাই হচ্ছেন।
সংঘর্ষ হলে আহত হচ্ছেন তাঁরাই।
পরিবারে উপার্জন বন্ধ হলে তার দায়ও পড়ছে তাঁদের ঘাড়ে।
কিন্তু নেতৃত্ব যদি দেশের বাইরে নিরাপদ অবস্থানে থেকে শুধু কর্মীদের রাস্তায় নামার আহ্বান জানায়, তাহলে সেই রাজনীতির নৈতিক দায় কোথায়?
রাজনীতিতে আবেগ প্রয়োজন, আদর্শ প্রয়োজন, দলের প্রতি ভালোবাসাও প্রয়োজন। কিন্তু অন্ধ আনুগত্য কোনো রাজনৈতিক আদর্শ হতে পারে না। একজন কর্মীর নিজের জীবন, পরিবার, সন্তান ও ভবিষ্যতের প্রতিও দায়িত্ব আছে।
আজকের বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের সাধারণ কর্মীদের তাই আবেগের পাশাপাশি আত্মসমালোচনাও প্রয়োজন। অতীতের ভুল, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, দলীয়করণ, রাজনৈতিক সহিংসতা কিংবা মানুষের ক্ষোভ—এসব প্রশ্ন এড়িয়ে শুধু পুরোনো স্লোগান ও মিছিলের রাজনীতি দিয়ে নতুন বাস্তবতায় ফিরে আসা সম্ভব নয়।
একইভাবে বিএনপির জন্যও এই সময়টি আত্মতুষ্টির নয়। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, জবাবদিহি, মানবিকতা এবং রাজনৈতিক সহনশীলতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।
কারণ জনগণ এখন শুধু কে আওয়ামী লীগ আর কে বিএনপি—সেটা দেখতে চায় না।
তারা দেখতে চায়—
কে জনগণের পাশে থাকবে?
কে ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত করবে না?
কে কর্মীদের জীবনকে রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করবে না?
কে দেশে থেকে দেশের মানুষের সঙ্গে থাকবে?
আর কে ক্ষমতায় গিয়ে জনগণের কাছে জবাবদিহি করবে?
নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সামনে তাই পথ একটাই—শুধু মিছিল, স্লোগান কিংবা বিদেশ থেকে দেওয়া নির্দেশ নয়; বরং আত্মসমালোচনা, নেতৃত্বের জবাবদিহি, রাজনৈতিক সংস্কার এবং জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের পথ।
আর আওয়ামী লীগের সাধারণ নেতাকর্মীদেরও বুঝতে হবে—
কোনো নেতার জন্য নিজের জীবন, পরিবার ও ভবিষ্যৎ ধ্বংস করা রাজনীতি নয়।
নেতৃত্ব যদি সত্যিই কর্মীদের ভালোবাসে, তবে তাদের অকারণে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে না।
আর যে রাজনীতি কর্মীদের সামনে পাঠায়, কিন্তু নেতৃত্ব নিজে নিরাপদ দূরত্বে থাকে—সেই রাজনীতির হিসাব একদিন কর্মীরাই চাইবে।
শেষ পর্যন্ত দল নয়, নেতা নয়—জনগণই ইতিহাসের চূড়ান্ত বিচারক।
কলমে- সৈয়দ শাহীদ হোসেন বাবু।