عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، قَالَ لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فِي الْخَمْرِ عَشَرَةً عَاصِرَهَا وَمُعْتَصِرَهَا وَشَارِبَهَا وَحَامِلَهَا وَالْمَحْمُولَةَ إِلَيْهِ وَسَاقِيَهَا وَبَائِعَهَا وَآكِلَ ثَمَنِهَا وَالْمُشْتَرِيَ لَهَا وَالْمُشْتَرَاةَ لَهُ .
‘আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, শারাবের সঙ্গে সম্পৃক্ত দশ শ্রেণির লোককে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অভিসম্পাত করেছেন। এরা হলো—মদ তৈরিকারী, মদের ফরমায়েশকারী, মদ পানকারী, মদ বহনকারী, যার জন্য মদ বহন করা হয়, মদ পরিবেশনকারী, মদ বিক্রয়কারী, এর মূল্য ভোগকারী, মদ ক্রেতা এবং যার জন্য মদ ক্রয় করা হয়।’ (তিরমিজি, হাদিস ১২৯৫)
হাদিসের সারমর্ম
রাসুলুল্লাহ (সা.) এই হাদিসে মদের সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জড়িত দশ শ্রেণির মানুষকে অভিসম্পাত (لعن) করেছেন। লা’নাত মানে হচ্ছে— আল্লাহর রহমত থেকে দূরে থাকা।
হাদিসের ভষ্যমতে উক্ত দশ শ্রেণি
১. عاصرها (মদ তৈরিকারী): যে আঙ্গুর বা অন্য ফল চেপে মদ তৈরি করে।
২. معتصرها (যার জন্য তৈরি করা হয়) : যে অর্ডার দেয় বা তৈরি করায়।
৩. شاربها (মদ পানকারী): যে নিজে পান করে।
৪. حاملها (বহনকারী): যে পরিবহন করে।
৫. المحمولة إليه (যার কাছে পৌঁছানো হয়) : যার জন্য বহন করা হয়।
৬. ساقيها (পরিবেশনকারী) : যে ঢেলে দেয় বা পরিবেশন করে।
৭. بائعها (বিক্রেতা) : যে মদ বিক্রি করে।
৮. آكل ثمنها (মূল্যভোগকারী) : যে মদের বিক্রয়মূল্য খায় বা ভোগ করে।
৯. مشتريها (ক্রেতা) : যে ক্রয় করে।
১০. المشتراة له (যার জন্য ক্রয় করা হয়) : যার হয়ে অন্য কেউ ক্রয় করে আনে।
ইমাম নববী (রহ.) বলেন : ‘এই হাদিস প্রমাণ করে যে, মদ সম্পর্কিত সব ধরনের সহযোগিতা—তৈরি, বিক্রি, পরিবহন, অর্থ লেনদেন ইত্যাদি—প্রত্যেকটিই হারাম। এমনকি যে পরোক্ষভাবে মদের প্রসারে ভূমিকা রাখে, সেও গুনাহে শরিক।’ (শারহু সহিহ মুসলিম, খণ্ড ১৩, পৃ. ১৬০) তিনি আরও বলেন, এখানে ‘লানত’ শুধু মদ পানকারীর জন্য নয়, বরং মদের ব্যবসায়িক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক চক্রে যুক্ত সকলের ওপর আল্লাহর অভিশাপ।
ইমাম ইবনু হাজার আল-আসকালানী (রহঃ) বলেন, ‘রাসুল (সা.) মদ সম্পর্কিত দশজনের ওপর লা’নাত করেছেন—এর দ্বারা বোঝা যায়, মদের বিষয়টি শুধু ‘পান’-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি এমন এক অপরাধ, যার প্রতিটি স্তরই আল্লাহর ক্রোধ আহ্বান করে।’ (ফাতুহুল বারি, খণ্ড ১০, পৃ. ৪৫)
তিনি আরও বলেন, ‘যে কেউ এমন কাজে সহযোগিতা করে যা হারামকে শক্তিশালী করে, সে পাপের অংশীদার। যেমন, মদের পাত্র বানানো, পরিবহন করা, সংরক্ষণ করা, এমনকি মদের বিজ্ঞাপন করা—সবই এ নিষেধের আওতায় পড়ে।’
ফিকহি ব্যাখ্যা
মদ বিক্রয় হারাম ও অবৈধ আয়:
ইবনু কুদামা বলেন, ‘মদের মূল্য ভোগ করা হারাম, কারণ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তা ‘অশুচি’ ও ‘নাজিস’ ঘোষণা করেছেন।’ (আল-মুগনি, খণ্ড ৪, পৃ. ১৫২)
মদের ব্যবসা বা সহযোগিতায় চাকরি করাও হারাম:
ইমাম নববী বলেন— ‘যে ব্যক্তি জানে তার কাজ মদের বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত, সে আয় হালাল নয়।’ (আল-মাজমূ, খণ্ড ৯, পৃ. ২৩৩)
সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে শিক্ষা
এই হাদিস আজও প্রযোজ্য—মদের কারখানা, বিয়ার বা ওয়াইন কোম্পানিতে কাজ করা, মদ পরিবহনকারী ট্রাক চালানো, হোটেল, রেস্টুরেন্টে মদ পরিবেশন করা, শেয়ারবাজারে অ্যালকোহল কম্পানির শেয়ার কেনা, এমনকি বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রচার করা—সবই এই হাদিসের অন্তর্ভুক্ত নিষিদ্ধ কর্ম।
রাসুল (সা.)-এর এই লা’নাতপূর্ণ বাণী আমাদের শেখায় যে, মদ শুধু ব্যক্তিগত নেশা নয়, বরং একটি সামাজিক ব্যাধি। ইসলামী শরিয়াহ এর প্রতিটি স্তরে ‘মদ সংস্কৃতি’কে নির্মূল করতে চায়। যে সমাজে মদের উৎপাদন, বাণিজ্য ও প্রচলন থামবে, সেখানে নৈতিকতা, পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক নিরাপত্তা দৃঢ় হবে।