স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থেকে পাপেট শিল্পীদের প্রশিক্ষণ, কর্মশালা পরিচালনা এবং নতুন প্রজন্মকে এ শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেন মুস্তাফা মনোয়ার।তার হাত ধরে দেশে পাপেট নির্মাণ, পাপেট পরিচালনা এবং পাপেটভিত্তিক নাট্যচর্চার একটি ধারাবাহিকতা তৈরি হয়।
সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্টজনরা মনে করেন, বাংলাদেশে পাপেট শিল্পের যে ভিত্তি আজ দৃশ্যমান, তার বড় অংশই মুস্তাফা মনোয়ারের হাতে নির্মিত। তিনি শুধু একজন শিল্পী নন, বরং একটি শিল্পধারার প্রাতিষ্ঠানিক রূপদাতা। তার সৃষ্টি ও প্রশিক্ষণে গড়ে ওঠা শিল্পীরাই আজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাপেট শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
১৯৮৪ সালে জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটে একটি অনুষ্ঠানে এসে প্রখ্যাত কবি পূর্ণেন্দু পাত্রী বলেছিলেন, ‘একটা দেশের জন্য একজন মুস্তফা মনোয়ারই যথেষ্ট’।
মুস্তাফা মনোয়ার কর্মজীবন শুরু করেন পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে প্রভাষক পদে। ১৯৬৪ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের স্টেশন প্রডিউসার হিসেবে যোগ দেন। পরে দীর্ঘদিন বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি জাতীয় পারফর্মিং আর্টস একাডেডি, জাতীয় সমপ্রচার একাডেডি এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৬ সালে বিটিভির জাতীয় টেলিভিশন প্রতিযোগিতা ‘নতুন কুঁড়ি’ শুরুর পেছনেও তার অবদান রয়েছে।
বাংলাদেশ থিয়েটার পাপেট অ্যান্ড এনিমেশনের তিনি পরিকল্পক, গবেষক ও উদ্ভাবক। তার পাপেট শিল্প সুর, কথা, গান, অভিনয়, চিত্রকলা, কবিতা সব শিল্পকে ধরে আছে। পাপেট নিয়ে বহুদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আছে তার। প্রথমবার তিনি তার নিজের পাপেট দলসহ বাংলাদেশের ফোক পাপেট দল ধনমিয়াকে নিয়ে মস্কো ও তাশখন্দ সফর করেন। সেখানে বাংলাদেশের ফোক পাপেট ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেন। বাংলাদেশ টেলিভিশন থেকে প্রচারিত তার ‘পাপেট’ এর মাধ্যমে শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান ‘ক’ ও ‘খ’ জাপানে ও পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের টিভি অনুষ্ঠান প্রতিযোগিতায় পুরস্কার লাভ করে। ১৯৮২ সালে তিনি কলম্বোয় ‘এনিমেশন অ্যান্ড পাপেট ফর টেলিভিশন’ বিষয়ক আনত্মজার্তিক সম্মেলনে বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমন্ত্রিত হয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন।
মুস্তাফা মনোয়ার ১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর মাগুরা জেলার নাকোল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক বাড়ি ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে। তিনি প্রখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফার সন্তান। শিল্প ও সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন।