ইসলামের দৃষ্টিতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর একজন আদর্শ সদস্যের মধ্যে কিছু গুণ থাকা আবশ্যক।
এ ছাড়া হাদিসের ভাষ্য থেকে বোঝা যায়, খাঁটি ঈমান মানুষকে অন্যায় অপরাধ থেকে দূরে রাখে। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যভিচারী মুমিন অবস্থায় ব্যভিচার করে না এবং কোনো চোর মুমিন অবস্থায় চুরি করে না।
৩. দায়িত্ব ও অঙ্গীকার রক্ষা করা : যাঁদের ওপর সমাজ ও রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়, তাঁরা বিশেষ শপথ ও অঙ্গীকারের মাধ্যমে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।ইসলামের দৃষ্টিতে এই অঙ্গীকার রক্ষা করা আবশ্যক। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা নিজেদের আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে।’ (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ৮)
৫. দায়িত্ব পালনে সক্ষম হওয়া : আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যদের নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের শারীরিক, মানসিক ও নৈতিক সক্ষমতা থাকা আবশ্যক। শারীরিক সক্ষমতা হলো শারীরিক শক্তি ও সামর্থ্য, মানসিক সক্ষমতা হলো বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা, আনুগত্য ও প্রতিকূল পরিবেশ সহ্যের ক্ষমতা আর নৈতিক সক্ষমতা হলো আত্মসংযম ও চারিত্রিক দৃঢ়তা। পবিত্র কোরআনে এই গুণের প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে বলা হয়েছে, ‘তাদের একজন বলল, হে আমার পিতা! তাকে কর্মে নিয়োগ করুন। নিশ্চয়ই আপনি যাদের নিয়োগ করবেন, তাদের মধ্যে উত্তম সে-ই, যে শক্তিশালী ও আমানতদার।’ (সুরা : কাসাস, আয়াত : ২৬)
আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম তাবারি (রহ.) বলেন, শক্তিশালী হলো যে অর্পিত দায়িত্ব পালনের সামর্থ্য রাখে এবং যাদের ব্যাপারে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তাদের সংশোধন ও কল্যাণকামিতায় অবিচল থাকে। আমানতদার হলো যার ব্যাপারে অর্পিত দায়িত্বের ব্যাপারে খেয়ানতের আশঙ্কা করা হয় না। (তাফসিরে তাবারি : ৬/২০)
৬. ন্যায়পরায়ণ হওয়া : আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো মানুষের অধিকার রক্ষা করা। আর ন্যায়পরায়ণ না হলে এই দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়। কেননা তাদের পক্ষপাতমূলক আচরণ ন্যায়বিচারকে ধূলিসাৎ করে দেয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়বিচার না করতে প্ররোচিত করে। তোমরা ন্যায়বিচার কোরো; সেটিই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৮)
সদস্য নিয়োগেও চাই সততা
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর হাতে মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্ভ্রমের নিরাপত্তা প্রদানের দায়িত্ব অর্পিত থাকে। তাই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত বাহিনীতে সদস্য নিয়োগে সততা ও স্বচ্ছতা রক্ষা করা আবশ্যক। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন যে তোমরা আমানত তার যোগ্য ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেবে। আর যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে, তখন ন্যায়বিচার করবে।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৫৮)
ইমাম তাবারি (রহ.) বলেন, ‘এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে মুসলিম সমাজের নেতৃস্থানীয় ও দায়িত্বশীলদের প্রতি সম্বোধন। মুসলমানদের সম্পদ ও অধিকারের যে দায়িত্ব তাদের ওপর অর্পিত হয়েছে এবং তাদের যেসব বিষয় তাদের কাছে আমানত রাখা হয়েছে তারা যেন তা আমানতদারিতার সঙ্গে পালন করে।’ (তাফসিরে তাবারি : ২/৪৯১)
রাসুলুল্লাহ (সা.) অযোগ্য ব্যক্তিকে দায়িত্ব অর্পণের ব্যাপারে সতর্ক করে বলেছেন, ‘যখন আমানত নষ্ট করা হবে, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা কোরো। জিজ্ঞাসা করা হলো আমানত কিভাবে নষ্ট হবে? তিনি বললেন, যখন দায়িত্ব অনুপযুক্ত ব্যক্তির হাতে অর্পণ করা হবে, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা কোরো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪৯৬)
সদস্য নিয়োগে সোনালি যুগের বিবেচ্য গুণাবলি
ইসলামী সোনালি যুগে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্য নিয়োগে নিম্নের গুণাবলি দেখা হতো—
১. গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব, ২. সময় সচেতনতা, ৩. বিচক্ষণতা, ৪. সাহসিকতা, ৫. চারিত্রিক দৃঢ়তা, ৬. ইসলামী খেলাফতের প্রতি আনুগত্য, ৭. শারীরিক সুস্থতা, শক্তি, সামর্থ্য ইত্যাদি।
হাজ্জাজ বিন ইউসুফ আস-সাকাফিকে খলিফা মারওয়ান ইবনে আবদুল মালিক ইরাক ও আরব উপদ্বীপের ‘আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী’র প্রধান নিয়োগের দায়িত্ব দেন। তখন তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয় আপনি কেমন লোক চান? সে বলল, ‘ধৈর্যশীল, বিশ্বস্ত, চারিত্রিক দুর্বলতামুক্ত, ন্যায়পরায়ণ ও ক্ষমতাশীলদের দ্বারা প্রভাবিত নয়—এমন। তখন তারা আবদুর রহমান ইবনে উবাইদ তামিমির নাম প্রস্তাব করে।’ (উয়ুনুল আখবার : ১/১৭)
আল্লাহ সবুাইকে দ্বিনের সঠিক জ্ঞান দান করুন। আমিন।