প্রস্তাবিত বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন থাকার বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়ার প্রস্তাব করেছেন সংসদ নেতা, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
আরও কয়েকটি ক্ষেত্রে শুল্ক–কর কমানোর পাশাপাশি ‘কালো টাকা সাদা করার’ বিতর্কিত বিধান প্রত্যাহার করতে অর্থমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনের আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তার সংশোধনীর প্রস্তাব অর্থমন্ত্রী ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সামনে তুলে ধরেন।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে সকালে সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। প্রথমে বাজেট আলোচনায় অংশ নেন বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান। এর পর সংসদ নেতা তারেক রহমান বক্তব্য দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “নরমালি দাবিটা বিরোধী দল থেকে হয়ে থাকে। আমি আপাতত ফিজিক্যালি না হলেও মানসিকভাবে তাদের পাশে গিয়ে কথা বলতে চাই।”
করদাতাদের স্বস্তি দিতে ব্যক্তিগত আয়কর অব্যাহতির সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী।
এই সীমা যথাক্রমে ৪ লাখ, সাড়ে ৪ লাখ এবং ৫ লাখ টাকা করার প্রস্তাব রাখেন সংসদ নেতা।
স্বপ্রণোদিত বিনিয়োগ প্রদর্শনসংক্রান্ত বিধান নিয়ে জনমনে ‘প্রশ্ন ও উদ্বেগ’ তৈরি হওয়ার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জমি প্রকৃত মূল্যে নিবন্ধন না হওয়ার কারণে করদাতাদের হয়রানি কমাতে ওই বিধান আনা হয়েছিল।
তবে অনেকেই বিষয়টিকে ‘কালোটাকা সাদা করার’ সুযোগ হিসেবে দেখায় প্রস্তাবিত ওই বিধান প্রত্যাহার করার জন্য অর্থমন্ত্রীকে অনুরোধ করেন সংসদ নেতা।
ব্যাংক হিসাব খোলা, বণ্টননামা দলিল নিবন্ধন ও সম্পত্তি নামজারির ক্ষেত্রে টিআইএন সনদ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব নিয়ে জনমনে ‘বিভ্রান্তি’ সৃষ্টি হচ্ছে বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী। সে কারণে তিনি ওই প্রস্তাব প্রত্যাহারের সুপারিশ করেন।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর বিদ্যমান ১০ শতাংশ কর কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেন তিনি।
তবে শর্ত দিতে হবে যে, কর–সুবিধার বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, ভাষা শিক্ষা ও ল্যাঙ্গুয়েজ ল্যাব করতে হবে এবং দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা বেতনে পড়াশোনার সুযোগ বাড়াতে হবে।
এ সময়ে সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্য টেবিল চাপড়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবকে অভিনন্দন জানায়।
পার্বত্য ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য কর-সুবিধা আরও সম্প্রসারণের প্রস্তাব দেন তারেক রহমান।
তিনি বলেন, “দেশের তিনটি পার্বত্য জেলায় বিশেষ করে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ব্যক্তিদের যে বেতন এবং তাদের আর্থিক পরিসম্পদ খাতে যে অর্জিত আয়, এটা ছাড়া পার্বত্য জেলার পরিচালিত যে সকল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে আয় করমুক্ত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে উপস্থাপিত বাজেট।
“আমি মাননীয় অর্থ এবং পরিকল্পনা মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে অনুরোধ রাখতে চাই যে পার্বত্য জেলার যে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী আছে, তাদের করমুক্ত আয়ের এই সুবিধাটা আরেকটু বাড়িয়ে তাদের ব্যবসা কৃষি খাতসহ অন্যান্য আয়ের পাশাপাশি বেতনের আয়কেও করমুক্ত করা। এটা পাহাড়ি এবং সমতল উভয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর যারা আছেন, উভয় ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।”
চিংড়িশিল্পের প্রসার ও রপ্তানি বাড়াতে প্রধানমন্ত্রী ফিড অ্যাডিটিভ, প্রোবায়োটিকস, ভিটামিন, মিনারেলস এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানির ওপর আরোপিত শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব করেন।
এ ছাড়া স্থানীয় শিল্পের বিকাশে বিভিন্ন কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানোর সুপারিশ করেন। তিনি বলেন, ওষুধ ও শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত মধু আমদানির ওপর ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার করা উচিত।
পাশাপাশি পিইটি রেজিন, পিভিসি, কোল্ড-রোলড শিট, রোল প্রোডাক্টের অক্সাইডসহ বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামালের ওপর প্রস্তাবিত শুল্ক কমাতে বা প্রত্যাহার করতে অর্থমন্ত্রীকে অনুরোধ জানান তিনি।
বৈদ্যুতিক তারের জন্য কপার আমদানিতে ১০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে অপ্রক্রিয়াজাত কাজু বাদাম আমদানিতে প্রস্তাবিত ১৫ শতাংশ কাস্টম শুল্ক কমিয়ে ৫ শতাংশ করার সুপারিশ করেন তারেক রহমান।
তিনি স্থানীয়ভাবে এলইডি ল্যাম্প উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এবং প্রি ফেব্রিকেটের বিল্ডিং উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা ৩০ জুন ২০৩০ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের অনেক ব্যবসায়ী বর্তমানে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া, ওটিটি প্লাটফর্ম, সার্চ ইঞ্জিন, অনলাইন মার্কেট প্লেস এবং অন্যান্য অনলাইন মিডিয়ার বিজ্ঞাপন প্রচার করেন। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট থাকায় অনেক সময় ব্যবসায়ীরা আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে বিজ্ঞাপনের অর্থ পরিশোধ না করে অন্যভাবে অনানুষ্ঠানিক উপায়ে অর্থ পরিশোধ করেন।
“ফলে ওই ব্যক্তির যেমন লাভ হচ্ছে না। একই দিকে সরকারও রাজস্ব হারাচ্ছে। আমি মাননীয় অর্থমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ জানাতে চাই যে, এইটার উপরে যে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আছে, সেটি কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হোক। এতে আমরা বিশ্বাস করি যে যারা অন্যভাবে পেমেন্টটা করছেন তারা উৎসাহিত হবেন প্রপার ওয়েতে পেমেন্টটা করার জন্য।”
স্বর্ণ বা স্বর্ণ অলঙ্কার বা প্লাটিনামের ক্ষেত্রে প্রতি ভরির উপরে আড়াই হাজার টাকা, ডায়মন্ডের ক্ষেত্রে প্রতি গ্রাম আড়াই হাজার টাকা এবং রূপার গহনার ক্ষেত্রে প্রতি ভরি একশ টাকা কর ভ্যাটের যে হার রয়েছে, তা পুনর্নির্ধারণের জন্য অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন প্রধানমন্ত্রী।
এছাড়া বিটিআরসির সঙ্গে টেলিকম কোম্পানিগুলোর রেভিনিউ শেয়ারিংয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ১৫ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার, সকল প্রকার মাঠ সরবারহের ক্ষেত্রে যোগানদার পর্যায়ে ১০ শতাংশ ভ্যাট থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করেন তিনি।
স্থানীয়ভাবে ডাবল কেবিন পিকআপ এবং মাইক্রোবাস উৎপাদনের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ যে ভ্যাট আছে, তা কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করেন প্রধানমন্ত্রী।
পরে বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান সংসদ নেতার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, “সাইকেলের ওপর সকল শুল্প প্রত্যাহার করে নেয়ার জন্য … উনি (প্রধানমন্ত্রী) যদি একটু মেহেরবানী করে মাননীয় অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, তাহলে বিরোধী দলের পক্ষে উনি যে ভূমিকা পালন করেছেন তা ষোলআনা পূরণ হয়ে যাবে।”
পরে সংসদ নেতা বলেন, “এইমাত্র বিরোধী দলের নেতা উনাদের অবস্থান থেকে একটি প্রস্তাব দিয়েছেন। আমি অর্থমন্ত্রীকে অনুরোধ করব এই প্রস্তাবটি সকল কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যতটুকু বিবেচনা করা যায়, উনি বিবেচনা করবেন।