২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে ‘পঞ্চদশ সংশোধনী আইন’ নামে পাস হয় এবং রাষ্ট্রপতি ২০১১ সালের ৩ জুলাই তাতে অনুমোদন দেন। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ৫৪টি ক্ষেত্রে সংযোজন, পরিমার্জন ও প্রতিস্থাপন করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার।
এরপর গত বছর ৩ নভেম্বর এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন (লিভটু আপিল) করেন চার রিট আবেদনকারী। বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মোফাজ্জল হোসেন ও জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও লিভ টু আপিল করেন। ১৩ নভেম্বর এসব লিভটু আপিল মঞ্জুর করে তাঁদের আপিল করার অনুমিত দেন সর্বাচ্চ আদালত। পরে তাঁরা নিয়মিত আপিল করেন। এরপর শুরু হয় শুনানি। এসব আপিলে শুনানি চলার মধ্যে গত বছর ২ ডিসেম্বর বিএনিপির পক্ষে এ মামলায় পক্ষভুক্ত হন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পরে ইন্টারভেনার (মধ্যস্ততাকারী সহযোগী) হিসেবে যুক্ত হয় আরো দুইটি সংগঠন।
গত ৬ জুলাই তিনটি আপিলে শুনানি শুরু হয়। রিটকারীদের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. শরীফ ভূইয়া। এরপর শুনানি শুরু করেন জামায়াতে ইসলামীর আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। আর ইন্টারভেনারদের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ইমরান এ সিদ্দিক, এ এস এম শাহরিয়ার কবির ও আইনজীবী হামিদুল মিজবাহ। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ অনীক রুশদ হক ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আবদুল্যাহ আল মাসুদ। গত বুধবার শেষ হলে বৃহস্পতিবার হাইকোর্টের রায় বহাল রেখে রায় দেন সর্বোচ্চ আদালত।
রায়ের পর রিটকারী পক্ষের আইনজীবী মো. শরীফ ভূইয়া সাংবাদিকদের বলেন, ‘দুই বছর আগে পঞ্চদশ সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে যে মামলা শুরু করেছিলাম, সর্বোচ্চ আদালত থেকে তার একটা পরিণীতি হলো। সেই কারণে দিনটিকে ঐতিহাসিক দিন বলে আমি মনে করি। হাইকোর্টের রায়টি আপিল বিভাগ কর্তৃক অনুমোদনের প্রয়োজন ছিল। কারণ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাতিল করার ফলেই কিন্তু দেশে একটা স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হয়েছিল। আর এই কারণেই পঞ্চদশ সংশোধনীটা বাতিল হওয়া প্রয়োজন ছিল, যাতে বাংলাদেশের সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করা যায়। আপিল বিভাগ যদিও আমাদের আপিল খারিজ করে দিয়েছেন। এর ফলে অর্থ যেটা দাঁড়িয়েছে যে, হাইকোর্টের রায় যেভাবে ছিল সেভাবেই বহাল থাকবে।’
আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় হুবুহু বহাল রাখায় সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে ‘স্ববিরোধীতা’ তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন এই আইনজীবী। এর পক্ষে তাঁর যুক্তি হচ্ছে- ‘সংবিধানের ১২৩(৩ক) অনুচ্ছেদ (অনুযায়ী সংসদ ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। আর সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমে পুনর্বহাল (ত্রয়োদশ সংশোধনী) হওয়া ‘৫৮ক’ অনুচ্ছেদে বলা আছে, সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করতে হবে। তো এখন যদি প্রথম বিধানটা পরিপালন করা হয় তাহলে তো সংসদ ভেঙে যাওয়ার আগেই নির্বাচন করে ফেলতে হবে। তখন তো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালুর সুযোগই থাকছে না। আর যদি সংসদ ভেঙ্গে যাওয়ার পর তত্বাবধায়ক সরকার গঠন করে নির্বাচন করতে চান, তাহলে প্রথম যে অনুচ্ছেদটির কথা বললাম, তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে। ফলে একটা স্ববিরোধীতা তৈরি হয়েছে সংবিধানে। তো এই জিনিসটার সুরাহা সংসদেই করতে হবে বলেই মনে হচ্ছে।’
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেলের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনিরও বলেছেন একই কথা। রায়ের পর এক ব্রিফিংয়ে এই আইনজীবী বলেন, ‘আপিল বিভাগের রায়ের মাধ্যমে হাইকোর্ট বিভাগে যে রায় হয়েছিল, সেটি বহাল রাখা হয়েছে। এর অর্থ হলো, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে হাইকোর্ট বিভাগ যে চারটি বিষয়কে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিলেন, সেই বিষয়গুলো অসাংবিধানিক থাকবে। এ ছাড়া বাকি যে বিষয়গুলো আছে, সেগুলো সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।’
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোট নিয়ে যা বলা হয়েছে হাইকোর্টের রায়ে
সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন সাত বিচারপতির আপিল বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে ২০১১ সালের ১০ মে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে সংক্ষিপ্ত রায় দেন। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের আগেই ওই বছর ১১ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ও গণভোটের বিধান বাতিলসহ ৫৪ টি বিষয়ে সংশোদন এনে সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী পাশ করে আওয়ামী লীগ সরকার।
ত্রয়োদশ সংশোধনীর সংক্ষিপ্ত রায় পঞ্চদশ সংশোধনীর সঙ্গে সাংঘর্ষিক উল্লেখ করে রায়ে বলা হয়েছে, একমাত্র গনভোটের মাধ্যমে সংবিধানের প্রস্তাবনা এবং মৌলিক কাঠামোতে পরিবর্তন আনা যায়। গণতন্ত্র হচ্ছে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো। গণতন্ত্র বিকশিত হয় একটি অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা মূল সংবিধানে না থাকলেও একটি অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ সংসদ নির্বাচনের অভিপ্রায়ে ১৯৯৬ সালে তা সংবিধানে যুক্ত করা হয়েছিল। ফলে এই ব্যবস্থাটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোরই অংশে পরিণত হয়েছে। কারণ, এই ব্যবস্থা বিলুপ্তির পর বিগত তিনটি সংসদ নির্চান (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৫) জনগণের আস্থার কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। এই তিনটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক কাঠামো এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার পাশাপাশি জনগণের আস্থাকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। যে কারণে সর্বশেষ সরকারকে জনগণের আন্দোলনের মুখে বিতাড়িত হতে হয়েছে। সরকারকে বিতাড়িত করতে গিয়ে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। শুধু তাই না, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জনগণের আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে একটি নতুন গণতন্ত্র, নতুন স্বাধীনতা, নতুন বাংলাদেশ, যা একটি অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে হবে। পঞ্চদশ সংশোধনী জনগণের এসব আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।
গণভোটের বিধান বাতিল করা নিয়ে রায়ে বলা হয়েছে, ১৯৯১ সালে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী মাধ্যমে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে গণভোটের বিধান যুক্ত করা হয়েছিল। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই বিধান বাদ দেওয়া হয়। এছাড়া জনমত বা জন আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ৮, ৪৮ ও ৫৬ অনুচ্ছেদ অসংশোধনযোগ্য ঘোষণা করা হয়, যা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোবিরোধী এবং অসঙ্গতিপূর্ণ। তাই পঞ্চদশ সংশোধনী আইন, ২০১১ এর ৪৭ ধারার মাধ্যমে ১৪২ অনুচ্ছেদ থেকে গণভোটের বিধান বাতিল করাকে বাতিল ঘোষণা করা হলো। ফলে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৪২ অনুচ্ছেদে যুক্ত করা গণভোটের বিধান পুনরুদ্ধার হলো।
সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা নিয়ে রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট রায়ে বলেন, ‘সংবিধান হচ্ছে একটি দেশের সর্বোচ্চ আইন। অন্য সব আইনই সংবিধানের নিরিখে হওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট হচ্ছে সংবিধানের অভিভাবক। যে কোনো আইনোর বৈধতা-অবৈধতা নিরূপন করার ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের রয়েছে।’
হাইকোর্টের ক্ষমতা সংক্রান্ত ৪৪(২) অনুচ্ছেদ বাতিল করা নিয়ে হাইকোর্ট রায়ে বলেন, ‘সংবিধান নিয়ে নির্বাহী বিভাগ এমনকি আইনসভার অনাকাঙ্ক্ষিত সংশোধনের বিচারিক পর্যালোচনা করার সম্পূর্ণ ক্ষমতা হাইকোর্টের রয়েছে। শুধু তাই না, সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে স্পর্শ করে এমন সংশোধন বাতিল ঘোষণা করার ক্ষমতাও হাইকোর্টের রয়েছে।’
রায়ে আদালত বলেন, আইনসভা (সংসদ) পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ৪৪ অনুচ্ছেদে ২ উপ-অনুচ্ছেদের যুক্ত করে হাইকোর্ট বিভাগের ক্ষমতা অধস্তন আদালত দ্বারা প্রয়োগ করার অনুমতি দিয়েছিল। সুতরাং, এটি সংবিধানের ৪৪(১) ও ১০২(১) অনুচ্ছেদের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। ফলে ৪৪(২) অনুচ্ছেদ বাতিল করা হলো।
সংবিধান বাতিল, স্থগিতকরণ অপরাধ হিসেবে গণ্য করা পঞ্চদশ সংশোধনীর ৭ক ও ৭খ অনুচ্ছেদ বাতিলের বিষয়ে রায়ে আদালত বলেন, ‘সংবিধান দেশের সর্বোচ্চ আইন। জনগণের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা এবং চিন্তার স্বাধীনতা, অভিব্যক্তিকে সর্বোচ্চ নিশ্চয়তা দেয় সংবিধান। কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ৭ক ও ৭খ উপঅনুচ্ছেদ যুক্ত করে সেই নিশ্চয়তাকে খর্ব করা হয়েছে, যা ৭ অনুচ্ছেদের বিধানের সম্পূর্ণ বিপরীত এবং চরম সংবিধানবিরোধী। যে কারণে ৭ অনুচ্ছেদ থেকে ৭ক ও ৭খ উপঅনুচ্ছেদ বাতিল ঘোষণা করা হলো।’
রায়ের পর্যবেক্ষণে উচ্চ আদালত আরো বলেন, ‘সংবিধান কেবল অতীত ও বর্তমানকে নিরূপন করে না। এটা ভবিষ্যতেরও দিশারী। একইভাবে সংবিধান কেবল একটি দালিলিক বিষয় নয়, উদ্ভুত পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য সংবিধান একটি জাতির ভিত্তি এবং মৌলিক নির্দেশকও। একই সঙ্গে তা বিকশমান এবং পরিবর্তনশীল।’
সাংবিধানিক ও আইনগত পরিবর্তন সংবিধানের মৌলিক কাঠামো অনুযায়ী করতে হবে উল্লেখ করে রায়ে বলা হয়েছে, সেজন্য আইন বিভাগকে অবারিত ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর মাধ্যমে আইন বিভাগ বা সংসদের ক্ষমতাকে সীমিত করা হয়েছে। পঞ্চদশ সংশোধীর মাধ্যমে মৌলিক কঠামোকে ধ্বংস করা হয়েছিল।