রাজধানীর পল্লবীতে ৮ বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার বিচার শুনানি শুরুর দিনে ১৭ সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর ‘শিশু সহিংসতা দমন’ ট্রাইব্যুনালে মামলার এই সাক্ষীরা সাক্ষ্য দেন। এদিন মামলার সাক্ষ্যগ্রহণও শেষ হয়েছে। আজ আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন সংক্রান্ত শুনানির জন্য দিন ধার্য করেছেন আদালত। এর মধ্য দিয়ে ঘটনার মাত্র ১৪ দিনের মাথায় নজিরবিহীন গতিতে বিচার সম্পন্নের দিকে এগুলো। মামলা দায়েরের পর অভিযোগপত্র দাখিল, অভিযোগ গঠনসহ সব ক্ষেত্রেই ছিল দ্রুতগতি। মামলায় আসামিদের বিচারের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু। অভিযোগপত্রে ছিল ১৮ সাক্ষীর নাম। তবে একজনের নাম দুবার অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সাক্ষীর সংখ্যা ১৭। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ শুভজয় বৈদ্যকে ছাড়া বাকি ১৬ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হলো।সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় এত দ্রুত বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে যাওয়ার নজির দেশে খুব কমই দেখা গেছে। সাধারণত তদন্ত, অভিযোগ গঠন ও সাক্ষ্যগ্রহণের বিভিন্ন ধাপ পার হতে বছরের পর বছর লেগে যায়। তবে এ মামলার অগ্রগতি সন্তোষজনক।
যেভাবে এগিয়েছে মামলা : ১৯ মে পল্লবীতে ঘটনাটি ঘটে। পরদিন ভিকটিমের বাবা পল্লবী থানায় মামলা করেন। তদন্তে মাঠে নামে পুলিশ। ঘটনার ৪ দিনের মাথায় ২৪ মে তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ওইদিনই আদালত অভিযোগপত্র আমলে নেন। ঈদের ছুটি শেষে ১ জুন আসামি সোহেল রানা ও স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। ২ জুন ১৬ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। বুধবার আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য দিন ধার্য রয়েছে।
আইন কী বলছে : নতুন সংশোধিত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী অভিযোগ গঠনের তারিখ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে বিচারকাজ শেষ করার কথা। আর তদন্ত কার্যক্রম ১৫ দিনের মধ্যে শেষ করার বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে মামলার শুনানি ধারাবাহিকভাবে পরিচালনারও নির্দেশনা রয়েছে। তবে বাস্তবে নানা কারণে অধিকাংশ মামলাই আইনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি হয় না। আদালতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাক্ষীর অনুপস্থিতি, তদন্তে বিলম্ব, সময়ের আবেদন এবং বিচারিক জটিলতার কারণে অনেক মামলার বিচার দীর্ঘ সময় চলতে থাকে। ফলে আইনের নির্ধারিত সময়সীমা প্রায়ই অতিক্রম হয়।
‘এটি ব্যতিক্রম নয়, নিয়ম হওয়া উচিত’ : সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পল্লবীর এ মামলার বিচারিক অগ্রগতি দেখিয়ে দিয়েছে সমন্বিত উদ্যোগ থাকলে ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব। ভুক্তভোগী পরিবারসহ বিচারপ্রার্থীদের প্রত্যাশা-মামলাটি কেবল একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণই নয়, দেশের সব আদালতে বিচারাধীন ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতনের মামলার বিচারেও যেন একই ধরনের নিয়ম অনুসরণ করা হয়। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম যুগান্তরকে বলেন, আলোচিত একটি মামলার বিচার দ্রুত হওয়া ইতিবাচক। কিন্তু বিচারপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে সমতা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি। গণমাধ্যমের আলোচনার বাইরে থাকা অসংখ্য ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতনের মামলাও একই গুরুত্ব পাওয়ার অধিকার রাখে। এটি ব্যতিক্রম নয়, নিয়ম হওয়া উচিত। দ্রুত বিচার মানে তড়িঘড়ি বিচার নয়। আইনি প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করে অল্প সময়ে বিচার সম্পন্ন করা গেলে সেটি বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা বাড়াবে।
সাক্ষীদের বর্ণনায় উঠে এলো ভয়াবহ বর্ণনা : মঙ্গলবার মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, চিকিৎসক, সুরতহাল প্রস্তুতকারী কর্মকর্তা ও জবানবন্দি রেকর্ডকারী ম্যাজিস্ট্রেটসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দেন।
শিশুটির মা আদালতকে বলেন, রান্না করার সময় একটি চিৎকার শুনেছিলাম। ভেবেছিলাম পাশের বাসার কোনো শিশু হয়তো চিৎকার করছে। পরে মেয়েকে খুঁজে না পেয়ে ভবনের বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করি। একপর্যায়ে পাশের ফ্ল্যাটের সামনে মেয়ের জুতা দেখতে পাই। তখন মনে হয়, আগে শোনা চিৎকারটি হয়তো আমার মেয়েরই ছিল। আমি বারবার আসামি স্বপ্নাকে বলেছি, ‘বোন, দরজাটা খুলে দে।’ কিন্তু সে দরজা খোলেনি। আমরা বারবার দরজায় ধাক্কা দিলেও ভেতর থেকে কেউ সাড়া দেয়নি। পরে ফ্ল্যাটের ভেতরে রক্ত দেখতে পাই। এরপর আমার মেয়ের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
শিশুটির বাবা আদালতকে বলেন, ঘটনার দিন সকালে অফিসের উদ্দেশে বের হয়েছিলাম। সকাল ১০টা থেকে ১০টা ১৫ মিনিটের মধ্যে স্ত্রী ফোনে কল করে জরুরি ভিত্তিতে বাসায় আসতে বলে। কল পাওয়ার পর বাসায় ফিরতে আমার ২৫ থেকে ৩০ মিনিট লাগে। এসে দেখি আমাদের ফ্ল্যাটের সামনে অনেক মানুষ জড়ো হয়েছে। দ্রুত ওপরে উঠে যাই। তখন আমার স্ত্রী অনেকক্ষণ পাশের ফ্ল্যাটের দরজায় ডাকাডাকি করছিল; কিন্তু কেউ দরজা খুলছিল না। পরে আমি হাতুড়ি দিয়ে দরজার লক ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করি। ভেতরে ঢুকে টয়লেটের সামনে রক্ত দেখতে পাই। ঘটনার আগে আমি আসামিদের চিনতাম না, জীবনেও দেখিনি।
সুরতহাল প্রস্তুতকারী কর্মকর্তা এসআই ইকবাল হোসেন আদালতকে জানান, ঘটনাস্থলে গিয়ে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয় এবং ঘটনাস্থল থেকে ছুরি, সেলাই রেঞ্জ, পোশাক, জুতা ও ওড়নাসহ বিভিন্ন আলামত জব্দ করা হয়। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ডা. নাসরাত জাবিন সাক্ষ্যে বলেন, ময়নাতদন্তে শিশুটির শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন এবং যৌন নির্যাতনের আলামত পাওয়া গেছে। তার মতে, হত্যার আগে শিশুটিকে ধর্ষণ করা হয়েছিল। মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদ আদালতকে জানান, আইন অনুযায়ী আসামির স্বেচ্ছায় দেওয়া জবানবন্দি তিনি রেকর্ড করেছেন। তদন্ত কর্মকর্তা এসআই অহিদুজ্জামান তার সাক্ষ্যে বলেন, ঘটনাস্থল পরিদর্শন, আলামত সংগ্রহ, সাক্ষীদের জবানবন্দি, ময়নাতদন্ত ও অন্যান্য প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে আমি অভিযোগপত্র দাখিল করেছি। তদন্তে প্রধান আসামির বিরুদ্ধে ধর্ষণ, হত্যা ও লাশ গুমের চেষ্টার অভিযোগের সমর্থনে পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে। জেরা চলাকালে তদন্ত কর্মকর্তা জানান, আশপাশে কোনো সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যায়নি। তবে ঘটনাস্থল, আলামত ও সাক্ষ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করে তিনি অভিযোগপত্র দাখিল করেছেন। এদিন আদালতে মামলার জব্দকৃত বিভিন্ন আলামতও উপস্থাপন করা হয়। পরে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা সাক্ষীদের জেরা করেন।