প্রবীণদের মর্যাদার ক্ষেত্রে ইসলামের সবচেয়ে শক্তিশালী নির্দেশনা এসেছে মা-বাবার ব্যাপারে। আল্লাহ তাআলা নিজের ইবাদতের নির্দেশের পরই মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণের কথা বলেছেন।তিনি বলেন, ‘তোমার প্রতিপালক আদেশ করেছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না এবং মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদের ‘উফ’ বলো না এবং তাদের ধমক দিও না; বরং তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ২৩)
রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রবীণদের সম্মানকে মুসলিম চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং আমাদের বড়দের মর্যাদা ও অধিকার স্বীকার করে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৪৩)
প্রবীণরা পরিবারের বোঝা নন
অনেক সময় বয়স বাড়লে মানুষ কর্মক্ষমতা হারান।তখন কেউ কেউ তাদের অর্থনৈতিকভাবে অপ্রয়োজনীয় মনে করেন। ইসলাম এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি সমর্থন করে না। একজন প্রবীণের মূল্য শুধু তার উপার্জনক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না। তার জীবনের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, পরামর্শ, দোয়া, পারিবারিক ইতিহাস ও নৈতিক শিক্ষা একটি পরিবারের অমূল্য সম্পদ। তাই প্রবীণদের পাশে বসা, তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, পরামর্শ নেওয়া এবং পারিবারিক সিদ্ধান্তে তাদের মর্যাদা দেওয়া উচিত।
১. সম্মানজনক ভাষায় কথা বলা। বয়সের কারণে তারা একই কথা বারবার বলতে পারেন বা কোনো বিষয় বুঝতে সময় নিতে পারেন। এতে বিরক্ত না হয়ে ধৈর্যের সঙ্গে কথা বলতে হবে।
২. প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানো। চিকিৎসা, ওষুধ, চলাফেরা, খাবার ও দৈনন্দিন প্রয়োজনের ক্ষেত্রে তাদের সহযোগিতা করা সন্তান ও পরিবারের দায়িত্ব।
৩. একাকিত্ব দূর করা। প্রবীণ মানুষের সবচেয়ে বড় কষ্টগুলোর একটি হলো একাকিত্ব। প্রতিদিন কিছু সময় তাদের সঙ্গে কথা বলা, খোঁজ নেওয়া ও সময় দেওয়া তাদের মানসিক প্রশান্তি বাড়াতে পারে।
৪. সিদ্ধান্তে তাদের মর্যাদা দেওয়া। বয়স হয়েছে বলে তাদের মতামত মূল্যহীন হয়ে যায় না। বরং জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কারণে অনেক বিষয়ে তাদের পরামর্শ অত্যন্ত মূল্যবান হতে পারে।
৫. তাদের আর্থিক ও সামাজিক অধিকার রক্ষা করা। তাদের সম্পদ, উত্তরাধিকার বা আর্থিক অধিকার অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করা যাবে না। তাদের সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
৬. বেশি বেশি দোয়া করা। প্রবীণ মা-বাবার জন্য কোরআনের শেখানো দোয়া পড়া উচিত—
رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
অর্থ : ‘হে আমার রব! তাদের প্রতি দয়া করুন, যেমন তারা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ২৪)
একজন প্রবীণ শিক্ষক হয়তো বহু প্রজন্মকে শিক্ষিত করেছেন। একজন কৃষক হয়তো সারাজীবন মানুষের খাদ্য উৎপাদন করেছেন। একজন শ্রমিক হয়তো পরিবার ও সমাজের উন্নয়নে নিজের শক্তি ব্যয় করেছেন। একজন আলেম, চিকিৎসক, ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তা বা সমাজকর্মী তার জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে সমাজকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাই অবসর নেওয়া মানেই অবদান শেষ হয়ে যাওয়া নয়। প্রবীণদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে সমাজ আরও সমৃদ্ধ হতে পারে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মা-বাবা ও সব প্রবীণ মানুষের প্রতি সম্মান, ভালোবাসা ও দায়িত্বশীল আচরণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।