সমাজে যখন এক শ্রেণির মানুষ সম্পদের মালিক হয়ে ওঠে আর অন্য শ্রেণির মানুষ শ্রম দিয়েও ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়, তখন সেই বৈষম্য শাহ আব্দুল করিমের গানে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
শাহ আব্দুল করিমের দর্শনের কেন্দ্রে ছিল মানুষ। ধর্ম, বর্ণ, জাত, শ্রেণি কিংবা সামাজিক অবস্থান দিয়ে মানুষের মূল্য নির্ধারণের বিরোধিতা করেছেন তিনি।বাউল দর্শনের মানবতাবাদী চেতনা তার গানে গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছে।
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, সামাজিক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক নির্ভরতার পরিবর্তনও তিনি অনুভব করেছিলেন। তাই গানটি শুধু অতীতের স্মৃতির কথা বলে না; বরং বর্তমান সমাজের নানা সংকট নিয়েও ভাবতে বাধ্য করে।
শোষিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান
শাহ আব্দুল করিমের গান সাধারণ মানুষের জীবন থেকে উঠে এসেছে। তার গানে কৃষক-শ্রমিকের কথা আছে, অভাবী মানুষের কথা আছে, বঞ্চিত মানুষের কথা আছে। এই কারণেই তার গান শুনলে প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রাম চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তার সৃষ্টির মধ্যে রয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করার শক্তি। তিনি মানুষকে কেবল নিজের কথা ভাবতে বলেননি বরং অন্য মানুষের দুঃখ ও অধিকার নিয়েও ভাবতে শিখিয়েছেন।
সম্প্রীতি ও মানবতার শিক্ষা
বর্তমান সময়ে সামাজিক বিভাজন নানা রূপে দৃশ্যমান। ধর্ম, মত, রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থনৈতিক অবস্থান কিংবা সামাজিক মর্যাদাকে কেন্দ্র করে মানুষে মানুষে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। এমন সময়ে শাহ আব্দুল করিমের মানবতাবাদী দর্শন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তার গান মানুষকে বিভেদের দেয়াল পেরিয়ে মানুষের কাছে যেতে শেখায়। তার সৃষ্টিতে সম্প্রীতি ও সহমর্মিতার যে বার্তা রয়েছে, তা একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কেন আজও প্রাসঙ্গিক শাহ আব্দুল করিম
শাহ আব্দুল করিম নেই, কিন্তু তার গানের আবেদন শেষ হয়ে যায়নি। বরং সময়ের সঙ্গে তার গান নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। কারণ সমাজে এখনো অর্থনৈতিক বৈষম্য রয়েছে। এখনো বহু মানুষ শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষ এখনো ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রাম করছেন। এই বাস্তবতার মধ্যেই শাহ আব্দুল করিমের গান আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায় উন্নয়ন কি কেবল কিছু মানুষের জন্য, নাকি সমাজের প্রতিটি মানুষের জন্য?
নতুন প্রজন্মের কাছে করিমের বার্তা
শাহ আব্দুল করিমের গান শুধু অতীতের স্মৃতি হিসেবে সংরক্ষণ করলে তার প্রতি যথাযথ সম্মান দেখানো হবে না। তার গান থেকে নতুন প্রজন্মকে মানবিকতা, সাম্য, সহমর্মিতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের শিক্ষা নিতে হবে।তার গান নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি এর সামাজিক ও মানবিক দর্শন নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন। কারণ একটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়তে শুধু আইন বা নীতিমালা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন মানুষের চিন্তা ও মূল্যবোধের পরিবর্তন।
গান থেকে সমাজ বদলের স্বপ্ন
শাহ আব্দুল করিম ছিলেন ভাটি বাংলার গণমানুষের শিল্পী। তার গানে যেমন আছে হাওরের প্রকৃতি, প্রেম ও বিরহ, তেমনি আছে মানুষের দুঃখ, শোষণ, বঞ্চনা ও অধিকারহীনতার কথা।তিনি গানের মাধ্যমে এমন এক সমাজের স্বপ্ন দেখিয়েছেন, যেখানে মানুষে মানুষে বিভেদ থাকবে না, থাকবে না শোষণ-বঞ্চনা, প্রতিষ্ঠিত হবে মানুষের মর্যাদা ও অধিকার।
তাই শাহ আব্দুল করিমের গানকে শুধু লোকসংগীত হিসেবে দেখলে তার সৃষ্টির গভীরতা অনুধাবন করা সম্ভব নয়। তার গান আসলে সমাজের প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর। সেই কণ্ঠ আজও আমাদের প্রশ্ন করে-মানুষের জন্য কেমন সমাজ আমরা রেখে যেতে চাই?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে শাহ আব্দুল করিমের গান আমাদের বারবার ফিরিয়ে নিয়ে যায় সাম্য, মানবতা ও বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্নের কাছে।শাহ আব্দুল করিমের পুত্র বাউল শাহ নুর জালাল বলেন, ‘আমরা বাবা গণমানুষের পক্ষে গান গেয়েছেন। তার গানের মূল বিষয় ছিল বৈষ্যমহীন সমাজ গঠনের বার্তা। তিনি সবসময় মানুষ ও সম্প্রীতির জয়গান গেয়েছেন।’