বিশ্বকাপ এমন একটি মঞ্চ যেখানে শুধু ভালো দল কিংবা বড় নাম দিয়ে সেরা হওয়া যায় না। সেরা হতে হলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে মানসিক দৃঢ়তা, স্কোয়াডের গভীরতা, বড় ম্যাচে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা এবং চাপের মুহূর্তে শান্ত থাকার মানসিকতা।
বিশ্বকাপ এমন একটি মঞ্চ যেখানে শুধু ভালো দল কিংবা বড় নাম দিয়ে সেরা হওয়া যায় না। সেরা হতে হলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে মানসিক দৃঢ়তা, স্কোয়াডের গভীরতা, বড় ম্যাচে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা এবং চাপের মুহূর্তে শান্ত থাকার মানসিকতা।
ফরাসিদের এই দলের প্রাণভোমরা নিঃসন্দেহে কিলিয়ান এমবাপ্পে। আধুনিক ফুটবলে খুব কম খেলোয়াড় আছে যারা একাই প্রতিপক্ষের পুরো রক্ষণভাগের পরিকল্পনা বদলে দিতে পারে। এমবাপ্পে সেই বিরল ফুটবলারদের একজন। তার গতি অসাধারণ, কিন্তু শুধু গতি দিয়েই তাকে ব্যাখ্যা করা যাবে না। সে পরিস্থিতির দাবি বুঝে খেলে থাকে। আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, সে বড় ম্যাচের খেলোয়াড়। ভয়ডরহীন ফুটবল খেলতে ভালোবাসে। যেটার প্রমাণ আমরা আগের বিশ্বকাপের ফাইনালে দেখেছি। তার সেই হ্যাটট্রিক এখনো সবার মনে উঁকি দেয়। আমি মনে করি, এবারের বিশ্বকাপে আমরা এমবাপ্পের সবচেয়ে সেরা সংস্করণ দেখতে পাব। এখন সে কোনো তরুণ তারকা নয়, সে দলের নেতা। দলের অন্য খেলোয়াড়রা তাকে দেখে আত্মবিশ্বাস পায়। বিশ্বকাপ জিততে এই ধরনের ব্যক্তিত্ব খুব প্রয়োজন। যেমনটা ছিল ২০২২ বিশ্বকাপে লিওনেল মেসি।
তবে আমার কাছে মনে হয়, ফ্রান্সের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, তাদের দলীয় শক্তি। শুধু একজন খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভর করে না তারা। অনেক দল আছে যারা একজন সুপারস্টারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। সেই খেলোয়াড়কে আটকে দিলে পুরো দল থেমে যায়। ফ্রান্সের ক্ষেত্রে সেটা হয় না। উসমান দেম্বেলে যখন ছন্দে থাকে, তখন তাকে থামানো প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের জন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে যায়। তার ড্রিবলিং এবং দুই পায়ে খেলার ক্ষমতা অসাধারণ। মাইকেল ওলিসের মধ্যে আমি বিশেষ ধরনের সৃজনশীলতা দেখি। আধুনিক ফুটবলে এখন অনেক দল খুব কাঠামোগতভাবে খেলে, কিন্তু ওলিসের মতো খেলোয়াড় হঠাৎ করেই ম্যাচের গল্প বদলে দিতে পারে। এ ছাড়া ব্র্যাডলি বারকোলা, রায়ান চেরকি কিংবা দেসিরে দুয়ের মতো তরুণরা ফ্রান্সকে আরো ভয়ংকর করে তুলেছে। ম্যানচেস্টার সিটিতে চেরকি তো নিজেকে নতুন করে চিনিয়েছে। পেপ গার্দিওলার মূল অস্ত্রই এখন সে। হ্যাঁ, আর্লিং হালান্ড আছে সেই দলে, কিন্তু এখন সিটির মূল স্পন্দন হচ্ছে চেরকি। এই খেলোয়াড়দের মধ্যে ভয়ডর কম, আত্মবিশ্বাস বেশি। বড় টুর্নামেন্টে অনেক সময় তরুণদের এই সাহস পার্থক্য গড়ে দেয়।
মিডফিল্ডের কথাও আলাদা করে বলতে হবে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে মিডফিল্ডই আসলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করে। অরিলিয়ে চুয়োমেনি এই মুহূর্ত বিশ্বের অন্যতম সেরা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার। সে শুধু প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নেয় না, খেলার গতি নিয়ন্ত্রণও করতে পারে। তার মধ্যে আমি অসাধারণ ম্যাচ ইন্টেলিজেন্স দেখি। এনগোলো কন্তের অভিজ্ঞতা এখনো ফ্রান্সের জন্য আলাদা গুরুত্ব বহন করে। বয়স বাড়লেও নৈপুণ্যের ধার এখনো কমেনি। বড় ম্যাচে এখনো স্বমহিমায় পারফরম করে যাচ্ছে। তাদের সঙ্গে সৃজনশীলতা বাড়াতে আছে আন্দ্রে রাবিও। দারুণ একজন মিডফিল্ডার। তার বল পেতেই আক্রমণভাগে অপেক্ষায় থাকবে এমবাপ্পে, দেম্বেলেরা। রাবিওর সঙ্গে দুই তরুণ ওয়ারেন জাইরে-এমেরি এবং মানু কোনে নতুন কিছু যোগ করবে। যারা কিনা বিশ্ব মঞ্চে প্রথমবার নিজেদের প্রমাণের সুযোগ পাচ্ছে। একই সঙ্গে ফ্রান্সের ভবিষ্যৎও তারাই।
রক্ষণভাগও ফ্রান্সকে এগিয়ে রাখবে। যদিও এই বিভাগে বিকল্প আরো বেশি প্রয়োজন ছিল। তবে যারা আছে, তারাও যথেষ্ট সাফল্য পেতে পারে। সেন্টারব্যাক উইলিয়াম সালিবার দিকে নজর থাকবে। দলের ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় সে। একজন ডিফেন্ডারের সবচেয়ে বড় গুণ শুধু ট্যাকল করা নয়, বরং চাপের মধ্যে শান্ত থাকা। সালিবার মধ্যে সেই গুণ আছে। সে আতঙ্কিত হয় না। বড় ম্যাচে এই ধরনের মানসিকতা দলকে অনেক দূর নিয়ে যায়। তার সঙ্গে ইব্রাহিম কোনাতে এবং দায়োত উপামেকানো শারীরিকভাবে শক্তিশালী এবং দ্রুতগতির ডিফেন্ডার। আধুনিক ফুটবলে যেখানে আক্রমণভাগের গতি অনেক বেড়ে গেছে, সেখানে এই ধরনের ডিফেন্ডার খুব প্রয়োজন। লেফট ব্যাক থিও হার্নান্দেজ আবার রক্ষণ ও আক্রমণের মধ্যে দুর্দান্ত ভারসাম্য তৈরি করে।
গোলপোস্টের নিচে মাইক মাইগনান ফ্রান্সের বড় আস্থার নাম। আমি সব সময় মনে করি, বিশ্বকাপ জিততে একজন নির্ভরযোগ্য গোলরক্ষক খুব গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় পুরো টুর্নামেন্ট একটি সেভের ওপর নির্ভর করে। মাইগনানের মধ্যে সেই ম্যাচ বাঁচানোর ক্ষমতা আছে। আরেকটি জায়গায় আমি ফ্রান্সকে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে রাখব—স্কোয়াডের গভীরতা। বিশ্বকাপের মতো দীর্ঘ আসরে ইনজুরি, ক্লান্তি বা নিষেধাজ্ঞা আসবেই। ফ্রান্সের সুবিধা হলো, তাদের বেঞ্চেও বিশ্বমানের খেলোয়াড় আছে। একজনের জায়গায় আরেকজন নামলেও দলের মান খুব বেশি কমে যায় না। সব শেষে কোচ দিদিয়ের দেশমকে নিয়ে বলতে চাই। যদিও তাঁকে নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। এরপর তিনি বিশ্বকাপজয়ী কোচ। অনেক অভিজ্ঞতা তাঁর দেশম জানেন কিভাবে বিশ্বকাপের চাপ সামলাতে হয়। তিনি জানেন, কখন আক্রমণাত্মক হতে হবে, কখন ধৈর্য ধরতে হবে। হয়তো তাঁর ফুটবল সব সময় দর্শনীয় নয়, কিন্তু কার্যকর। আর বিশ্বকাপে শেষ পর্যন্ত কার্যকারিতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
অবশ্যই ফেভারিট হওয়া মানেই চ্যাম্পিয়ন হওয়া নয়। বিশ্বকাপে ছোট একটি ভুলও সবকিছু বদলে দিতে পারে। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ইংল্যান্ড কিংবা স্পেন—সবাই শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হবে। কিন্তু যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, কোন দলটি সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ, সবচেয়ে প্রস্তুত এবং সবচেয়ে ভয়ংকর—তাহলে আমি ফ্রান্সের নামই বলব। কারণ এই দলের মধ্যে শুধু প্রতিভা নেই, আছে চ্যাম্পিয়নের মতো আত্মবিশ্বাসও।
লেখক : কোচ, বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল