শৈশব থেকেই মেধার স্বাক্ষর রেখে আসছিলেন। হাবিবুল্লাহ তখন সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। সেবার প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় আরবিতে মাত্র ১৪ নম্বর পেয়েছিলাম। হুজুর তখন বাবার কাছে এসে নালিশ করলেন, ‘আপনার ছেলে তো আরবির কিছুই পারে না।’ হাবিবুল্লাহর বাবা ছিলেন একাধারে চিকিৎসক, শিক্ষক। বকাঝকা না করে তিনি নিজেই পড়াতে শুরু করলেন ছেলেকে। পরবর্তী পরীক্ষায় ১০০ নম্বরের মধ্যে ৯৮ পেয়েছিলেন হাবিবুল্লাহ। হাই স্কুলে পড়ার সময় ‘পড়ুয়ার পুঁথি’ নামে বিদ্যালয় একটি পত্রিকা বের হতো। তিন বছর এটির সম্পাদনা করেছেন হাবিবুল্লাহ।
স্বর্ণপদক পেয়েছিলেন
১৯৯২ সালে রামানন্দ হাই স্কুল (কিশোরগঞ্জ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়) থেকে এসএসসি পরীক্ষায় বৃহত্তর ময়মনসিংহে প্রথম হয়ে রায় সাহেব মেমোরিয়াল গোল্ডেন অ্যাওয়ার্ড পান তিনি। পরে ভর্তি হয়েছিলেন নটর ডেম কলেজে। দুর্ভাগ্যবশত আবাসনসংকট, খাওয়াদাওয়ার কষ্ট এবং প্রচণ্ড মানসিক চাপের কারণে তিন মাস পরে কলেজ ছাড়তে বাধ্য হন। গ্রামে ফিরে বাবাকে বললেন, ‘বাবা, আমি কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল কলেজ থেকেই পুনরায় পরীক্ষা দেব।’ সেখান থেকে গড়পড়তা নম্বর নিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। এ সময়টায় পরীক্ষার মাসখানেক আগে থেকে তীব্র পরীক্ষাভীতি (এক্সাম ফোবিয়া) দেখা দিত হাবিবুল্লাহর। যে কারণে ঠিকঠাক খাওয়াদাওয়া করতে পারতেন না, অসুস্থ হয়ে পড়তেন। প্রায় সব পরীক্ষাই সিকবেটে (অসুস্থ শয্যায়) দিয়েছিলেন।
মনোরোগ বিদ্যায় অনুরাগ
১৯৯৫-৯৬ সালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির সুযোগ পান হাবিবুল্লাহ। শুরু থেকেই মনোরোগ বিজ্ঞান বা সাইকিয়াট্রির প্রতি ছিল অগাধ অনুরাগ। সেখানে তৎকালীন বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক এ এস মোহাম্মদ ফিরোজের হাত ধরেই সাইকিয়াট্রিতে হাতেখড়ি হয় তার। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশের প্রথম মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক পত্রিকা ‘মনোজগৎ’-এ কাজ শুরু করেন হাবিবুল্লাহ।
৫০০ বছরেও পাস করতে পারবে না
সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু ১৯৯৮ সালের শেষ দিকের এক মানবিক উদ্যোগই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তখন প্রথম প্রফেশনাল এমবিবিএস পরীক্ষা দিয়েছিলেন তিনি। একদিন দেখলেন, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে অসুস্থ হয়ে পড়ে আছেন বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আব্দুল মোমেন তালুকদার। দৃশ্যটি দেখে অত্যন্ত অসহায় বোধ করেন হাবিবুল্লাহ। ঠিক করলেন, স্যারের জন্য একটা তহবিল গঠন করবেন। একটিও দরখাস্ত করে ফিজিওলজি, বায়োকেমিস্টি, ফার্মাকোলজি ও কমিউনিটি মেডিসিনসহ বিভাগীয় প্রধানের স্বাক্ষর নিলেন।
এরপর গেলেন মানসিক রোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. এ এইচ মোহাম্মদ ফিরোজের কাছে। তিনি স্বাক্ষর না করে বললেন, ‘তুমি এই দরখাস্ত ছিঁড়ে ফেলো। বরং আমাকে সদস্যসচিব রেখে কনফারেন্স রুমে একটা মিটিং কল করো।’ তবে ডা. ফিরোজ যেদিন সভা ডাকতে বললেন, সেদিন ছিল পিজি হাসপাতালে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নেওয়ার ডেট। সেটা হাবিবুল্লাহকে জানানো হয়নি। তিনি ঢাকা মেডিক্যালের সব বিভাগের প্রধানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সভার দিন কনফারেন্স রুমে উপস্থিত ফিজিওলজি ও বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের দুইজন শিক্ষক, ডা. সোলাইমান তানভীর এবং ব্যাচ কে-৫৪ এর কিছু শিক্ষার্থী। হাবিবুল্লাহ তখন ডা. ফিরোজেকে ফোন করেন। ‘আমি পিজি হাসপাতালে পরীক্ষা নিচ্ছি। তুমি মিটিং ক্যানসেল করে দাও।’ বলে জানালেন ডা. ফিরোজ। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ফিজিওলজি বিভাগের প্রধান ও অধ্যাপক এ এইচ এম মোল্যা তাকে বারবার অকৃতকার্য করান। হাবিবুল্লাহকে তিনি নিয়ে যান তৎকালীন অধ্যক্ষ আ ব ম আহসান উল্লাহর অফিসে।
তখন অধ্যক্ষ হাবিবুল্লাহকে বলেন, ‘তুমি ৫০০ বছরেও এমবিবিএস পাস করতে পারবে না। কারণ আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল ফ্যাকাল্টির ডিন।’ এই মানসিক নির্যাতন ও ক্রমাগত ফেল করানোর ফলে পড়াশোনা থেকে দূরে সরে যেতে বাধ্য হন হাবিবুল্লাহ। প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার দম্ভ কিভাবে এক মেধাবীকে তিলে তিলে ধ্বংস করতে পারে, হাবিবুল্লাহ তার জীবন্ত উদাহরণ।
অন্ধকার সময়
পরবর্তী দুই দশক হাবিবুল্লাহর জীবনে এক দীর্ঘ অন্ধকারের কাল। ২০০০ সালে বাবাকে হারালেন। ‘বাবাকে হারানোর পর মনে হয়েছিল নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছি।’ বছর দুয়েক পরে হারালেন স্ত্রীকেও। ব্যক্তিগত শোক আর শিক্ষা জীবনের অনিশ্চয়তা তাকে গভীর বিষাদে নিমজ্জিত করে। যে মানুষটি নিজে সাইকিয়াট্রিস্ট হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন, তিনিই দীর্ঘ ২০ বছর মনোরোগের সঙ্গে লড়েছেন। এই দীর্ঘ নির্বাসনে টিকে থাকতে কিশোরগঞ্জে একটি কোচিং সেন্টার পরিচালনা করতেন। কিন্তু অন্তরের সেই চিকিৎসক সত্তা তাকে বারবার তাড়া করে ফিরত। মনের ভেতর সব সময় তীব্র গ্লানি কাজ করত ‘চিকিৎসক হতে এসেও আমি পড়াশোনা শেষ করতে পারলাম না।’ তবে বড় ভাই লুৎফুর রহমান সিদ্দিকী সব সময় বলতেন, ‘তুমি যেকোনো সময় নতুন করে জীবন শুরু করতে পারো।’
আবার শুরু
২০২২ সালে হাবিবুল্লাহ এক অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত নিলেন যেকোনো মূল্যে নিজের স্বপ্ন পূরণ করবেন। পুনরায় ভর্তি হতে হলে আগের নথিপত্র লাগত। কিন্তু ২৫ বছর আগের নথিপত্র খুঁজে পাওয়া ছিল খড়ের গাদায় সুই খোঁজার মতো। ঢাকা মেডিক্যালের সিনিয়র অফিস সহকারী রফিকুল ইসলাম মামুন সেই অসাধ্য সাধন করলেন। তিনি হাবিবুল্লাহর ২৫ বছর আগের পুরনো ফাইল খুঁজে বের করে কাগজপত্র সংগ্রহ করে দেন। এরপর ঢাকা মেডিক্যালের একাডেমিক কাউন্সিলের বিশেষ সভা ডাকা হয়। যেখানে ৭৮ জন কাউন্সিল সদস্যের মুখোমুখি হয়ে হাবিবুল্লাহ তার জীবনের সত্যগুলো তুলে ধরেন। তার সততায় মুগ্ধ হয়ে কাউন্সিল তাকে পুনরায় পড়াশোনার অনুমতি দেয়। তবে শর্ত হলো প্রায় দুই লাখ টাকার মতো জরিমানা দিতে হবে। এক বছর নিয়মিত ওয়ার্ডে কাজ করতে হবে। ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত নিয়মিত ওয়ার্ড ক্লাস করেছিলেন।
বিরল দৃষ্টান্ত
এরপর সার্জারি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে প্রথমবারেই পাস করলেন। আবার দুই বছর গ্যাপ। পরে বাকি দুটি পরীক্ষাও সফলভাবে সম্পন্ন করে চূড়ান্তভাবে এমবিবিএস উত্তীর্ণ হলেন। নিজের চেয়ে ২২ বছরের ছোট শিক্ষার্থীদের সঙ্গে (কে-৭৫ ব্যাচ) ক্লাস করা এবং ওয়ার্ডে কাজ করা ছিল বিশাল চ্যালেঞ্জ। হাবিবুল্লাহ সেই চ্যালেঞ্জে ভালোভাবে জয়ীই শুধু হননি, বিরল এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
গত ২ সেপ্টেম্বর তিনি যখন চূড়ান্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন, তখন সময় যেন থমকে দাঁড়িয়ে তাকে অভিবাদন জানাল। তবে হাবিবুল্লাহর একটাই আফসোস—‘সময়মতো পড়াশোনা শেষ না করায় মা অনেক কেঁদেছিলেন। আজ যদি মা-বাবা বেঁচে থাকতেন, দেখতেন তাদের ছেলে সত্যিই ডাক্তার হয়েছে!’
হাবিবুল্লাহর শিক্ষক ও ঢামেকের সাবেক উপাধ্যাক্ষ ও নিউনেটাল বিভাগের অধ্যাপক ডা. আবদুল হানিফ টাবলু বলেন, ‘দীর্ঘ ২০ বছর পর পুনরায় পড়াশোনায় ফিরে আসার কারণে তার মধ্যে এক ধরনের দ্বিধা ও অনিশ্চয়তা কাজ করছিল যে শেষ পর্যন্ত পাস করতে পারবে কি না। তার জন্য বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। অবশেষে সমস্ত বাধা পেরিয়ে হাবিব সফলভাবে উত্তীর্ণ হলো। তার হাল না ছাড়ার মানসিকতা সত্যিই প্রশংসনীয়।’
ঢামেকের মানসিক রোগ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. রাজিবুর রহমান বলেন, “হাবিবুল্লাহ এমন এক অসাধ্য সাধন করে দেখিয়েছেন, যা যেকোনো মানুষ, মেডিক্যাল শিক্ষার্থী তথা এ দেশের তরুণদের জন্য একটি অনন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। ছয় মাস আগে তিনি প্রথম আমাদের বিভাগে আসেন, তখন আমাদের কাছে তার প্রথম কথাই ছিল, ‘আমি জীবনের সাথে অনেক যুদ্ধ করেছি। এই যুদ্ধে আমি আর জয়ী হতে পারছি না। বেঁচে থাকা না-থাকা এখন আমার কাছে সমান।’ কিন্তু আজ তিনি প্রমাণ করেছেন, জীবনের কোনো সমাপ্তি নেই; জীবনকে যেকোনো পরিস্থিতিতে যেকোনো বয়সেই নতুন করে শুরু করা যায়।”
কয়েক দিনের মধ্যে এক বছরের ইন্টার্নশিপ শুরু হবে হাবিবুল্লাহর। আগামীতে ডা. হাবিবুল্লাহ সাইকিয়াট্রি নিয়ে গবেষণা করতে চান।