চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কর্তৃপক্ষের পরিচালিত মোবাইল কোর্ট ও অভিযানে মোট দুই কোটি ৮৩ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ টাকা অর্থদণ্ড এবং ৭টি কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।কর্তৃপক্ষের হিসাবে এ সময়ে মোট ৭৪৪টি মোবাইল কোর্ট ও অভিযান পরিচালিত হয়েছে।বিএফএসএ’র মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বছরের শুরু থেকেই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম অব্যাহত ছিল। ফেব্রুয়ারিতে প্রধান কার্যালয়ের উদ্যোগে ৮টি মোবাইল কোর্ট ও অভিযান পরিচালনা করে ৬ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
জুনে প্রধান কার্যালয়ের মাধ্যমে ১২টি অভিযানে চার লাখ টাকা এবং জেলা ও মেট্রোপলিটন কার্যালয়ের মাধ্যমে ৭২টি অভিযানে ১৫ লাখ টাকা জরিমানা আদায় ও একজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
জুলাই মাসে প্রধান কার্যালয়ের মাধ্যমে ১৫টি অভিযানে ৬ লাখ টাকা এবং জেলা ও মেট্রোপলিটন কার্যালয়ের মাধ্যমে ১০৪টি অভিযানে ৪২ লাখ ২৬ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়।
বিএফএসএ’র সদস্য (আইন ও নীতি) ও চেয়ারম্যান (চলতি দায়িত্ব) মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে চলমান কার্যক্রম আরো জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে। জেলা পর্যায় থেকে দেশব্যাপী অভিযান ও মনিটরিং কার্যক্রম বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও সহায়তার বিষয়ে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিপণনের প্রতিটি পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। একই সঙ্গে খাদ্যের মূল উপাদানের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করা এবং অবৈধ রং, গন্ধ ও ক্ষতিকর অ্যাডিটিভসের ব্যবহার বন্ধে গবেষণা ও কারিগরি কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে।
কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি বিগত ৮ মাসে ১ হাজার ৩০৭টি খাদ্যস্থাপনায় মনিটরিং করা হয়েছে। বাজার, হোটেল-রেস্তোরাঁ, বেকারি, মিষ্টির দোকান, খাদ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন খাদ্যস্থাপনায় এসব কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এর মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবেশন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনে নিরাপদ খাদ্যবিধি অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা তদারকি করা হয়।
খাদ্য নিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো খাদ্যপণ্যের নমুনা পরীক্ষা। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিএফএসএ ১ হাজার ২১০টি খাদ্য নমুনা পরীক্ষা করেছে। বোতলজাত পানি, ভোজ্যতেল, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য, দই, গুঁড়া মসলা, শিশুখাদ্য ও বেকারি পণ্যসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য এ পরীক্ষার আওতায় এসেছে।
এদিকে নিরাপদ খাদ্য বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতেও বহুমুখী প্রচার কার্যক্রম চলছে। বাংলাদেশ টেলিভিশনে সচেতনতামূলক টিভিসি ও স্ক্রলবার্তা, বাংলাদেশ বেতারে অডিওবার্তা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি, রিলস ও ভিডিওর মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ, স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য উৎপাদন ও বিপণন এবং ভোক্তার করণীয় সম্পর্কে প্রচার করা হচ্ছে।
নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ অনুযায়ী অপরাধের ধরন ও তীব্রতার ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এই আইনে সর্বনিম্ন এক লাখ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানা এবং সর্বনিম্ন ছয় মাসের কারাদণ্ড থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের জেল অথবা উভয় দণ্ডের শাস্তির বিধান রয়েছে।
নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তির নিশ্চয়তায় ২০১৩ সালে আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। ২০১৫ সালে গঠন করা হয়েছে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ জাতিসংঘ বহু আগেই খাদ্য অধিকারকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশ জাতিসংঘ মানবাধিকার সনদে স্বাক্ষরকারী অন্যতম দেশ।
ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা ও মান আইন, ২০০৬-এর অধীনে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী বিভিন্ন শাস্তি ও আর্থিক জরিমানার বিধান রয়েছে।
এতে রয়েছে—নিম্নমানের বা ভেজাল খাদ্য বিক্রিতে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা। স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ভেজাল উপাদান রাখলে দুই লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা। অসুরক্ষিত বা বিষাক্ত খাদ্য তৈরি বা বিক্রি (ক্ষতি না হলে) তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং তিন লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্তিতে ছয় বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা এবং ভোক্তার মৃত্যু হলে- সর্বনিম্ন সাত বছর থেকে শুরু করে আজীবন কারাদণ্ড এবং কমপক্ষে ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
চীনের খাদ্য নিরাপত্তা আইনে খাদ্যে ভেজাল বা মানবদেহের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পদার্থ মেশানোর বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। এই আইনে ভেজাল ও অনিরাপদ খাদ্য সরবরাহ করলে উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স বাতিলসহ উচ্চ অঙ্কের আর্থিক জরিমানা করা হয়। এ ছাড়া গুরুতর পরিণতি ও প্রাণহানির ক্ষেত্রে- খাদ্যে বিষক্রিয়া বা ভেজালের কারণে যদি কারো মৃত্যু হয় বা জনস্বাস্থ্যে চরম বিপর্যয় ঘটে, তাহলে দোষীদের বিরুদ্ধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, এমনকি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার মতো কঠোর আইনি বিধান রয়েছে।
কর্তৃপক্ষ বলছে, অভিযান ও মনিটরিংয়ের পাশাপাশি খাদ্য পরীক্ষার সক্ষমতা এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর ফলে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ কার্যক্রম আরো কার্যকর হচ্ছে। ভবিষ্যতে জেলা পর্যায় থেকে দেশব্যাপী এসব কার্যক্রম আরো জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে।