দেশের শিশুদের স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা নিয়ে নতুন এক উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এনেছে ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। প্রায় ৬৩ হাজার পরিবারের ওপর পরিচালিত নতুন জরিপে দেখা গেছে, দেশের প্রতি ১০ শিশুর মধ্যে চারজনের রক্তে নিরাপদ সীমার ওপরে সিসার উপস্থিতি রয়েছে।
গতকাল রোববার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জরিপ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস-বহুনির্দেশক গুচ্ছ জরিপ) প্রতিবেদনে বলা হয়, ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুর ৩৮ শতাংশ এবং অন্তঃসত্ত্বাদের প্রায় ৮ শতাংশের রক্তে সিসার মাত্রা নিরাপদ সীমা ছাড়িয়েছে। দেশে প্রতি দুটি মেয়ের মধ্যে একটি মেয়ে বাল্যবিয়ের শিকার হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এ বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দুই দফায় প্রায় ৬৩ হাজার পরিবারের ওপর জরিপ পরিচালনা করা হয়। এখানে জাতীয় অগ্রাধিকার ও বৈশ্বিক মানদণ্ডের সঙ্গে সংগতি রেখে ১৭২টি মানদণ্ড ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ২৭টি সূচককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রথমবারের মতো অন্তঃসত্ত্বা ও শিশুর মধ্যে রক্তস্বল্পতা, সিসাসহ ভারী ধাতুর দূষণের মাত্রা পরীক্ষার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর আগে সর্বশেষ এমআইসিএসের প্রতিবেদনটি ছিল ২০১৯ সালের। ওই সময় থেকে কতটুকু অগ্রগতি বা অবনতি হয়েছে, তার তুলনামূলক চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে নতুন প্রতিবেদনে।
নতুন জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, দেশের প্রায় প্রতি ১০ শিশুর মধ্যে চারজনের রক্তেই ‘উদ্বেগজনক’ মাত্রায় সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুর ৩৮ শতাংশের (অর্থাৎ প্রায় প্রতি ১০ জনে চারজন শিশু) এবং অন্তঃসত্ত্বা নারীদের প্রায় ৮ শতাংশের রক্তে সিসার মাত্রা ‘নিরাপদ সীমার চেয়ে বেশি’। দেশের সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের সংখ্যা ঢাকায়; যেখানে ৬৫ শতাংশ বলে উঠে এসেছে জরিপে।
ইউনিসেফ বলছে, সিসাদূষণ শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে হুমকি সৃষ্টি করে এবং এর প্রভাব সব আর্থসামাজিক শ্রেণির ওপরই পড়ছে। আক্রান্ত শিশুর অর্ধেকের বেশি ধনী এবং ৩০ শতাংশ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বলেও জরিপের প্রতিবেদনে দেখা যায়। পানীয় জলের প্রায় অর্ধেক উৎস এবং গৃহস্থালিতে ব্যবহৃত পানির ৮০ শতাংশের বেশি নমুনা ই.কোলাই ব্যাকটেরিয়াদূষিত।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিবিএসের মহাপরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার। সম্মানিত অতিথি ছিলেন ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স।
রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, বাল্যবিয়ে ও শিশুমৃত্যুর হার প্রমাণ করে অগ্রগতি সম্ভব। সিসাদূষণ ও শিশুশ্রমের মতো সংকট লাখ লাখ শিশুকে সম্ভাবনা থেকে বঞ্চিত করছে। শিশুদের সুরক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
জরিপ প্রতিবেদনে বাল্যবিয়ের দুটি উপাত্ত দেওয়া হয়েছে। একটি তথ্যে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালের তুলনায় এ হার ৪ শতাংশ কমলেও বাল্যবিয়ে পরিস্থিতি এখনও উচ্চপর্যায়ে। দেশে এখন ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ের হার ৬০ শতাংশ থেকে নেমে ৫৬ শতাংশ হয়েছে। স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্র ও হাসপাতালে প্রসব বেড়েছে। তবে সেই সঙ্গে বেড়েছে অস্ত্রোপচারে (সিজারিয়ান সেকশন বা সি-সেকশন) শিশু জন্মের হার। নবজাতক থেকে শুরু করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর মৃত্যুর হার কমেছে। শিশুশ্রম ও স্কুলের বাইরে থাকা শিশুর হার বেড়েছে। ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগে বিয়ে হয়েছে ৪৭ শতাংশের; ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে এ হার ছিল ৫১ শতাংশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে দুটি কন্যাশিশুর মধ্যে প্রায় একটি শিশু, অর্থাৎ প্রায় ৩৬ লাখ মেয়ের এখনও ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই বিয়ে হচ্ছে। এতে দেশের উৎপাদনশীলতা ও মানবসম্পদের সম্ভাবনায় বছরে সাত থেকে আট বিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতি হচ্ছে। বর্তমান গতিতে চললে বাল্যবিয়ে নিরসনে ৬৪ বছরের বেশি সময় লাগবে।
জরিপে দেখা গেছে, কিশোরী মায়েদের সন্তান জন্ম দেওয়ার হার প্রতি হাজারে ৮৩ থেকে বেড়ে ৯২ হয়েছে। সি-সেকশন ২০১৯ সালের তুলনায় ১৬ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫২ শতাংশে। স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান বা হাসপাতালে প্রসব ১৮ শতাংশ হয়েছে ৭১ শতাংশ। শিশুশ্রম ২ শতাংশের বেশি বেড়ে হয়েছে ৯ শতাংশ। মাধ্যমিক স্কুলে পড়ার বয়সী শিশুদের স্কুলে না পড়ার হার ২ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৩৪ শতাংশ হয়েছে। জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর ব্যবহার ৫ শতাংশ কমে ৫৮ শতাংশ হয়েছে। মোট প্রজননহার (টিএফআর) ২ দশমিক ৩ থেকে ২ দশমিক ৪ হয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচনা সঞ্চালনা করার সময় সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বাল্যবিয়ের ক্ষেত্রে দুটি উপাত্ত এসেছে। নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্রে কোনটা ব্যবহার করা হবে, সেই প্রশ্ন থেকে যায়। কোনো ক্ষেত্রে হার কেন বাড়ছে, কোনো ক্ষেত্রে কেন কমছে; সেই পেছনের গল্পগুলো উঠে আসা উচিত।
প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেস্ম, ওয়াটারএইডের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক খায়রুল ইসলাম, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের জ্যেষ্ঠ ফেলো মাহীন সুলতান, সাবেক সচিব মো. সারোয়ার বারী এবং আইসিডিডিআর,বির পুষ্টি গবেষণা বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরিচালক থাডেয়াস ডেভিড মে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের পাঁচটি বয়সভিত্তিক গোষ্ঠীর প্রতিটি ধাপে শিশুমৃত্যুর হার কমেছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে জীবিত জন্ম নেওয়া প্রতি হাজার শিশুর মধ্যে ৩৩টি মারা যায়, যা আগে ছিল ৪০। খর্বকায় শিশুর হার ৪ শতাংশ কমে হয়েছে ২৪ শতাংশ। তবে শীর্ণকায় শিশুর হার ৩ শতাংশ বেড়ে হয়েছে প্রায় ১৩ শতাংশ। কম ওজনের শিশুর হার সামান্য বেড়ে ২৩ শতাংশ হয়েছে। অতি ওজনের শিশুর হার কিছুটা কমেছে। প্রসবপূর্ব সেবা চারবার নেওয়ার হার ৪৩ শতাংশ। প্রসবপূর্ব সেবা অন্তত একবার নেওয়ার হার ৫৮ থেকে বেড়ে প্রায় ৭৬ শতাংশ হয়েছে। তবে মানসম্মত চারবার সেবা নেওয়ার হার এখনও অনেক কম, মাত্র ৪৩ শতাংশ। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে মাত্র ৫৯ শতাংশের জন্মনিবন্ধন হয়েছে। জন্মনিবন্ধন না হওয়ায় অনেক শিশু আইনগত পরিচয় ও সেবাপ্রাপ্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।