তিনি বলেন, ‘আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি ১৯৭১ সালে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিল। ঠিক একইভাবে পঁচাত্তরে আবার ৭ নভেম্বর আধিপত্যবাদীদের হাত থেকে রক্ষার জন্য সেদিন সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে আধিপত্যবাদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করা হয়েছিল। একইভাবে পরবর্তী সময়ে নব্বইয়ে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এ দেশের জনগণ, এ দেশের খেটে খাওয়া মানুষ তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারকে ছিনিয়ে এনেছিল। কিন্তু তার পরও ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি। আমরা তারপর দেখেছি ১৯৭১ সালে এই দেশের মানুষ যেমন স্বাধীনতা অর্জন করেছিল, ২০২৪ সালে এ দেশের ছাত্র-জনতাসহ সর্বস্তরের মানুষ—কৃষক, শ্রমিক, গৃহবধূ, নারী-পুরুষ, মাদরাসার ছাত্রসহ দল-মত-নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ সেদিন ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এই দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করেছিল।’
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের মানুষ কথা বলার অধিকার ফিরে পেতে চায়। তারা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পেতে চায়। বাংলাদেশের মানুষ চায়, তারা তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী ন্যায্য অধিকার পাবে।
তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের সময় এসেছে সবাই মিলে দেশ গড়ার। এই দেশে যেমন পাহাড়ের মানুষ আছে, এই দেশে একইভাবে সমতলের মানুষ আছে। এই দেশে মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, হিন্দুসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ বসবাস করে। আমরা চাই, সবাই মিলে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলব আমরা, যেই বাংলাদেশের স্বপ্ন একজন মা দেখেন, অর্থাৎ একটি নিরাপদ বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলতে চাই। যে বাংলাদেশে একজন নারী, একজন পুরুষ, একজন শিশু যে-ই হোক না কেন, নিরাপদে ঘর থেকে বের হলে নিরাপদে ইনশাআল্লাহ ঘরে আবার ফিরে আসতে পারে।’
অন্য যেকোনো জনসমাবেশ থেকে ভিন্ন-ব্যতিক্রম এই সংবর্ধনায় শীর্ষ নেতাদের দল বেঁধে বক্তৃতা দেওয়ার কোনো আয়োজন ছিল না। যেন নেতার কথাই সবাই শোনার জন্য উদগ্রীব। তাই তো বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মানুষ যা জানতে চায়, যা শুনে শান্ত হতে চায়, তা-ই বলেছেন আপন মনে।
তারেক রহমান বলেন, ‘এই দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী, চার কোটিরও বেশি তরুণ প্রজন্মের সদস্য, পাঁচ কোটির মতো শিশু, ৪০ লাখের মতো প্রতিবন্ধী মানুষ রয়েছেন, কয়েক কোটি কৃষক-শ্রমিক রয়েছেন। আমরা যদি সবাই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই তাহলে আমরা এই লক্ষ-কোটি মানুষের সেই প্রত্যাশাগুলো পূরণ করতে পারি, ইনশাআল্লাহ। ১৯৭১ সালে আমাদের শহীদরা নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন এই রকম একটি বাংলাদেশ গঠনের জন্য। বিগত ১৫ বছর স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কথা বলায় শত শত হাজারো গুম-খুনের শিকার হয়েছে শুধু রাজনৈতিক দলের সদস্য নয়, নিরীহ মানুষও প্রতিবাদ করতে গিয়ে অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হয়েছে, জীবন দিয়েছে। ২০২৪ সাল, মাত্র সেদিনের ঘটনা। আমরা দেখেছি, আমাদের তরুণ প্রজন্মের সদস্যরা কিভাবে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছে দেশের এই স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করার জন্য।’
তারেক রহমান ইনকিলাব মঞ্চের ওসমান হাদির কথা স্মরণ করে বলেন, ‘কয়েক দিন আগে এই বাংলাদেশের চব্বিশের আন্দোলনের এক সাহসী প্রজন্মের এক সাহসী সদস্য ওসমান হাদিকে হত্যা করা হয়েছে। ওসমান হাদি শহীদ হয়েছে। ওসমান হাদি চেয়েছিল এই দেশের মানুষের জন্য গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হোক। এই দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক। এই দেশের মানুষ তাদের গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক অধিকার ফিরে পাক। আজ চব্বিশের আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছে ওসমান হাদিসহ, ১৯৭১ সালে যারা শহীদ হয়েছে, বিগত স্বৈরাচারের সময় বিভিন্নভাবে খুন-গুমের শিকার হয়েছে, এই মানুষগুলোর রক্তের ঋণ যদি শোধ করতে হয়, আসুন আমরা আমাদের সেই প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলব।’
তরুণরাই আগামী দিনে নেতৃত্ব দেবেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তরুণ প্রজন্মের যে সদস্যরা আছেন আপনারাই আগামী দিনে দেশকে নেতৃত্ব দেবেন, দেশকে গড়ে তুলবেন। এই দায়িত্ব তরুণ প্রজন্মের সদস্যদের আজ গ্রহণ করতে হবে, যাতে করে এই দেশকে আমরা সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে পারি শক্ত ভিত্তির ওপরে। গণতান্ত্রিক ভিত্তি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপরে, যাতে এই দেশকে আমরা গড়ে তুলতে পারি।’
তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা সবাই মিলে এই দেশকে নেতৃত্ব দিয়ে আমাদের বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশিত সেই বাংলাদেশকে আমরা গড়ে তুলতে চাই। আমাদের যেকোনো মূল্যে, যেকোনো মূল্যে আমাদের এই দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করতে হবে। যেকোনো উসকানির মুখে আমাদের ধীর ও শান্ত থাকতে হবে। আমরা দেশের শান্তি চাই। আমরা দেশের শান্তি চাই। আমরা দেশে শান্তি চাই।’
তিনি বলেন, ‘আসুন আমরা সবাই মিলে প্রতিজ্ঞা করি, ইনশাআল্লাহ আগামী দিনে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে যারা আসবে, আমরা সবাই নবী করিম (সা.)-এর যে ন্যায়পরায়ণতা, সেই ন্যায়পরায়ণতার আলোকে আমরা দেশ পরিচালনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।’
নিজের মায়ের ত্যাগের কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘আপনারা জানেন, এখান থেকে আমি আমার মা দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার কাছে যাব। যে মানুষটি এই দেশের মাটি, এই দেশের মানুষকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবেসেছেন, তাঁর সঙ্গে কী হয়েছে আপনারা প্রত্যেকটি মানুষ সে সম্পর্কে অবগত আছেন। সন্তান হিসেবে আপনাদের কাছে আমি চাইব, আল্লাহর দরবারে আপনারা দোয়া করবেন, যাতে আল্লাহ উনাকে তৌফিক দেন, উনি যাতে সুস্থ হতে পারেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘সন্তান হিসেবে আমার মন আমার মায়ের বিছানার পাশে পড়ে আছে, সেই হাসপাতালের ঘরে। কিন্তু সেই মানুষটি যাদের জন্য জীবনকে উৎসর্গ করেছেন, অর্থাৎ আপনারা, এই মানুষগুলোকে, যাদের জন্য দেশনেত্রী খালেদা জিয়া জীবন উৎসর্গ করেছেন, সেই মানুষগুলোকে আমি কোনোভাবেই ফেলে যেতে পারি না। সে জন্যই আজ হাসপাতালে যাওয়ার আগে আপনাদের প্রতি, যাঁরা সমগ্র বাংলাদেশে আমাকে দেখছেন, আপনাদের সবার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্য আজ আমি এখানে দাঁড়িয়েছি।’
সবার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আপনাদের সবার কাছে দোয়া চেয়ে, আবারও সবাইকে যেকোনো মূল্যে দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার আহবান জানিয়ে, যেকোনো বিশৃঙ্খলাকে পরিহার করে, ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবেলা করার আহবান জানিয়ে আমার বক্তব্য শেষ করছি।’
অভ্যর্থনা মঞ্চে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়াও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য, সিনিয়র নেতৃবৃন্দ এবং শরিক দলের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।