ভার্চুয়াল সভায় সরকারি ও বেসরকারি খাতের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানস্বল্পোন্নত দেশ থেকে একটি টেকসই ও মসৃণ অর্থনৈতিক রূপান্তর নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশের উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর বাড়ানোর প্রস্তাবকে জোরালো সমর্থন জানিয়েছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)।

বিজিএমইএ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, জাতিসংঘ যদি বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা বর্ধিত করার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করে, তবে এই অতিরিক্ত সময়ের মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট ‘রোডম্যাপ’ প্রণয়ন করা সম্ভব হবে। সরকার ও বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগে একযোগে কাজ করার মাধ্যমে শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করে সামগ্রিক অর্থনীতির একটি শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে সংগঠনটি মনে করে।
এই পরিস্থিতিতে একটি টেকসই ও মসৃণ উত্তরণ নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের এনহ্যান্সড মনিটরিং মেকানিজমের অন্তর্গত ‘ক্রাইসিস রেসপন্স’ বা সংকটকালীন বিশেষ বিধানের আওতায় এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা ২০২৬ সাল থেকে পিছিয়ে ২০২৯ সাল পর্যন্ত করার জন্য বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘের কাছে আবেদন জানিয়েছে। উক্ত প্রস্তাবের প্রেক্ষাপটে, গত ২৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (ইউএন-সিডিপি) বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ ভার্চুয়াল পরামর্শ সভায় মিলিত হয়।
বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন মাননীয় বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, মাননীয় অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং মাননীয় পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মোঃ জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি। এই প্রতিনিধি দলে বিডা’র চেয়ারম্যান এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিবসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
সভায় বেসরকারি খাতের পক্ষ থেকেও বলিষ্ঠ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের নেতৃত্বে সংগঠনটির একটি প্রতিনিধিদল এই সভায় অংশ নেন, যেখানে বিজিএমইএ পরিচালক ফয়সাল সামাদও উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বাংলাদেশ পাদুকা ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির সভাপতি আব্দুল মুক্তাদির এবং ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি এর সভাপতি তাসকিন আহমেদসহ দেশের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী চেম্বারের প্রতিনিধিরা সভায় অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে তাদের অবস্থান তুলে ধরেন।
উপস্থাপনায় সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্যমান অর্থনৈতিক ঝুঁকি, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং বেসরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কাঠামোগত সীমাবদ্ধতাগুলো তুলে ধরা হয়। সেই সঙ্গে একটি সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি গ্রহণে বর্তমান সরকারের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কথা জানানো হয়।
সভায় বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান পোশাক খাতের টেকসই ভবিষ্যৎ রক্ষায় সুনির্দিষ্ট ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়গুলো অত্যন্ত জোরালোভাবে উত্থাপন করেন। তার তথ্যনির্ভর উপস্থাপনায় বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি প্লাস কাঠামোর আওতায় অনুচ্ছেদ ২৯ এর সেফগার্ড থ্রেশহোল্ডের কারণে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা হারানোর ঝুঁকি এবং এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের পর্যাপ্ত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটি) না থাকার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব পায়। এছাড়া রুলস অফ অরিজিন সংক্রান্ত দ্বৈত রূপান্তর বিধি পালনে সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে বিজিএমইএ এর পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সময়ের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
একইসাথে শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ব্যবসার খরচ কমিয়ে আনা এবং ‘ইজ অফ ডুইং বিজনেস’ বা বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে নীতির ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদী সংস্কারের অপরিহার্যতার বিষয়টিও উঠে আসে। এলডিসি উত্তরণের ফলে রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, তা মোকাবিলায় একটি টেকসই ও মসৃণ রূপান্তরের জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও আলোচনায় বিশেষভাবে স্থান পায়।
এই পরামর্শ সভার আগে ইআরডি বিভিন্ন অংশীজনদের সঙ্গে ধারাবাহিক প্রস্ততিমূলক আলোচনা সম্পন্ন করে, যাতে করে সবার অবস্থান ও দাবির বিষয়ে স্বচ্ছতা ও ঐক্য বজায় থাকে।
পরামর্শ সভাটি অত্যন্ত সফলভাবে শেষ হয়েছে। বাংলাদেশের সব অংশীজন একটি ঐক্যবদ্ধ এবং সুসংগত অবস্থান তুলে ধরেছেন এবং ইউএন-সিডিপি এর উত্থাপিত বিভিন্ন প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিয়েছেন। আশা করা যাচ্ছে যে, এই সুসমন্বিত এবং তথ্যভিত্তিক প্রচেষ্টা বাংলাদেশের আবেদনের পক্ষে একটি ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনতে সহায়ক হবে।