যাত্রী হয়রানি কমাতে নানা উদ্যোগ
মন্ত্রী জানান, আগে কনভেয়ার বেল্টে ছেঁড়া বেল্ট পাওয়া যেত এবং লাগেজ পেতে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা সময় লাগত। এখন এ পরিস্থিতির অনেকটাই উন্নতি হয়েছে। বিমানবন্দরের কর্মীদের শরীরে বডি ক্যামেরা যুক্ত করা হয়েছে। যাত্রীদের দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে কার্গোর দরজাও খোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে একদিকে যাত্রী নামার সময় অন্যদিকে লাগেজ নামানো যায়। এর ফলে ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে লাগেজ বেল্টে পৌঁছানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে লাগেজ পেতে ৪০ মিনিটের বেশি সময় লাগছে না।
তিনি জানান, আমরা কক্সবাজারে আরেকটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চালু করার শেষ পর্যায়ে আছি। পর্যটন শিল্পকে সমৃদ্ধ করার জন্য আমরা এরই মধ্যে নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। পিপিপি মডেল, যৌথ উদ্যোগ মডেল এবং যেগুলো আমরা চালাতে পারছি না, সেগুলো বেসরকারি খাতকে দিয়ে সচল করা হবে।
উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশ্যে মন্ত্রী বলেন, আমরা অনেক উদ্যোগ হাতে নিয়েছি। তবে আমাদের এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সময়ের প্রয়োজন। বর্তমানে বিভিন্ন সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী বিমানবন্দর সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্রমাগত অপতথ্য ছড়াচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে বণিক বার্তাসহ দেশের সব গণমাধ্যমের প্রতি আমার আহ্বান থাকবে—আপনারা অপতথ্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিরুদ্ধে পূর্বের তুলনায় আরও বেশি সতর্ক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবেন।
নীতিগত সহায়তা থাকবে : পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, এভিয়েশন খাতকে এগিয়ে নিতে সরকারের নীতিগত সহায়তা থাকবে। একইসঙ্গে ব্যবসার পরিবেশ সহজ করতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। দেশের এভিয়েশন খাতকে শক্তিশালী করার দায়িত্ব বাংলাদেশের নিজেদেরই নিতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে বিমানবন্দর অবকাঠামোর উন্নয়ন, জাতীয় এয়ারলাইনকে শক্তিশালী করা এবং আন্তর্জাতিক মানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশকেই নেতৃত্ব দিতে হবে।
তৃতীয় টার্মিনালকে দেশের এভিয়েশন খাতের জন্য বড় সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই টার্মিনালটি নিয়ে দ্রুত আলোচনা এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।
জনবল সংকট ও এশিয়া-প্যাসিফিকের সুযোগ
অনুষ্ঠানে ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিশ্বমানের এভিয়েশন’ বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মাহমুদ হোসেন। তিনি বলেন, বিশ্বের এভিয়েশন খাতে সবচেয়ে বেশি চাহিদা তৈরি হচ্ছে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে। তবে এয়ারক্রাফট উৎপাদনের ক্ষেত্রে এখনো পশ্চিমা দেশগুলো এগিয়ে রয়েছে। ফলে বাংলাদেশেরও এভিয়েশন ও অ্যারোস্পেস খাতের সম্ভাবনার দিকে আরও বেশি নজর দেওয়া উচিত।
লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ছাড়া এভিয়েশন দাঁড়াবে না
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন বলেছেন, এভিয়েশন হাব করতে দেশীয় এয়ারলাইন্সের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড না হলে বাংলাদেশে এভিয়েশন দাঁড়াবে না।
তিনি বলেন, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রানওয়েতে অপেক্ষার কারণে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ টাকা ক্ষতির মুখে পড়ছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস। ট্যাক্সিওয়েতে উড়োজাহাজকে ১০ থেকে ২০ মিনিট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত জ্বালানি পুড়ছে এবং সময়মতো ফ্লাইট পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি জানান, ইউএস-বাংলার একটি বোয়িংয়ের ক্ষেত্রে শুধু একটি রানওয়ের জন্য প্রায় ৩০০ কেজি বেশি জ্বালানি পুড়ে। একটি এয়ারবাসের ক্ষেত্রে প্রায় ৯০০ কেজি এবং ছোট একটি এটিআরের ক্ষেত্রে ২৫ মিনিটের ফ্লাইটে প্রায় ৭৫ কেজি জ্বালানি পুড়ে। ইউএস-বাংলা প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ টাকা ক্ষতির মুখে পড়ে। আমরা অন-টাইম মেইনটেইন করতে পারি না।
তিনি বলেন, যাত্রীদের বলা হয় ফ্লাইট ১৫ মিনিট দেরি হচ্ছে। কিন্তু এক্ষেত্রে এয়ারলাইন্সের কিছু করার থাকে না। এছাড়া থার্ড টার্মিনাল নির্মাণে এয়ার অপারেটরদের মতামত নেওয়া হয়নি। টার্মিনাল নির্মাণের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত অপারেটরদের কী প্রয়োজন বা তারা কী করতে চান, তা জানতে চাওয়া হয়নি। অথচ থার্ড টার্মিনাল সবার আগে অপারেটরদের জন্য।
তিনি জানান, ঢাকা থেকে কুয়ালালামপুর গেলে একজন যাত্রীকে ট্যাক্স ও ভ্যাট মিলিয়ে প্রায় ৯ হাজার ৮৯০ টাকা দিতে হয়। কুয়ালালামপুর থেকে ঢাকায় আসার সময় নেওয়া হয় মাত্র ২০০ টাকা। সিঙ্গাপুরের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ থেকে গেলে প্রায় ৯ হাজার ৮৯০ টাকা দিতে হয়। এ ছাড়া জ্বালানির দাম ও বিভিন্ন চার্জের কারণে এয়ারলাইন্সগুলোর ব্যয় বাড়ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
১৫ বিলিয়ন ডলারের বাজার সম্ভাবনা
টোটাল এয়ার সার্ভিসেস লিমিটেডের চেয়ারম্যান কে এম মুজিবুল হক বলেছেন, বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিমান ভ্রমণ এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজনীয়তা। সড়ক ও রেল যোগাযোগ যেমন পরিবহন ব্যবস্থার অংশ, বিমান চলাচলও তেমনি আকাশপথের পরিবহনব্যবস্থা। তাই সড়ক ও রেল যোগাযোগের মতো বিমান চলাচলকেও সহজলভ্য করতে হবে।
বিদেশি
কে এম মুজিবুল হক বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের বিমান চলাচল বাজারের আকার প্রায় ৫ থেকে ৬ বিলিয়ন ডলার। এ বাজারকে ১৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব। কার্গো পরিবহনের সক্ষমতাও ৫ লাখ টনে উন্নীত করতে হবে। তিনি জানান, বিশ্বের বিমান চলাচল বাজার প্রায় ৫ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের। এর মধ্যে বাংলাদেশের অংশ প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। দেশের বিমান চলাচল বাজারের প্রায় ২২ শতাংশ দেশীয় এবং ৭৭ শতাংশ বিদেশি এয়ারলাইনসের দখলে। প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে বিমান ভ্রমণ বাবদ প্রায় ১ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে।
বিমান খাতের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ সম্পদ থেকে কতটা আয় করা যাচ্ছে, সেটিও ভাবতে হবে। বর্তমানে জিডিপিতে বিমান চলাচল খাতের অবদান প্রায় ৮ শতাংশ বলে আমি মনে করি। অথচ এ খাতের সম্ভাবনাকে আরও বড় পরিসরে কাজে লাগানোই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত।
অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সদস্য (এটিএম) এয়ার কমডোর মো. নূর-ই-আলম, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন, টোটাল এয়ার সার্ভিসেস (টাস) গ্রুপের চেয়ারম্যান কে. এম. মুজিবুল হক এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) ও ঢাকা ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার।