নুয়াইম (রা.)-এর কথায় বনু কুরাইজার মনে গভীর সন্দেহ জন্ম নিল। তারা ভাবল, সত্যিই তো—যদি মিত্ররা পালিয়ে যায়, তবে তাদের রক্ষা করার কেউ থাকবে না। এরপর তিনি গেলেন মিত্রবাহিনীর প্রধান নেতা আবু সুফিয়ানের কাছে। সেখানে তিনি আরেকটি কৌশলী বার্তা পৌঁছে দিলেন। তিনি বললেন, ‘আমি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জেনেছি, বনু কুরাইজা মুহাম্মদের সঙ্গে পুনরায় সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করছে। তারা তোমাদের কয়েকজন নেতাকে জিম্মি হিসেবে চাইবে, এরপর সুযোগ পেলে তাদের মুহাম্মদের হাতে তুলে দেবে। তাই তারা যদি কাউকে জিম্মি হিসেবে চায়, কোনো অবস্থাতেই দেবে না।’
এর কিছুক্ষণ পরই কুরাইশ ও গাতফানের পক্ষ থেকে একটি প্রতিনিধিদল বনু কুরাইজার কাছে গিয়ে যৌথ আক্রমণের প্রস্তাব দিল। বনু কুরাইজা জবাব দিল, ‘আজ শনিবার, আমরা এদিন যুদ্ধ করব না। আর তোমরা আগে তোমাদের কয়েকজন নেতাকে জিম্মি হিসেবে আমাদের কাছে দাও, তারপর আমরা যুদ্ধে অংশ নেব।’ এই সংবাদ শুনে আবু সুফিয়ান বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘আল্লাহর শপথ! নুয়াইম আমাদের সত্য কথাই বলেছিল।’ অন্যদিকে কুরাইশদের পক্ষ থেকে জিম্মি দিতে অস্বীকৃতি জানানো হলে বনু কুরাইজাও বলে উঠল, ‘আল্লাহর শপথ! নুয়াইম আমাদের কাছেও সত্য কথাই বলেছিল।’
এভাবেই একটিমাত্র কৌশল দুই পক্ষের অন্তরে গভীর অবিশ্বাস সৃষ্টি করল। যারা একসঙ্গে মুসলিমদের নিশ্চিহ্ন করার পরিকল্পনা করেছিল, তারা পরস্পরের ওপরই আস্থা হারিয়ে ফেলল। বিশাল মিত্রজোটের ঐক্য ভেঙে গেল, মনোবল চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে পড়ল এবং তাদের সম্মিলিত আক্রমণের পরিকল্পনা কার্যত ব্যর্থ হয়ে গেল। এরপর আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতিশ্রুত সাহায্য পাঠালেন। প্রবল ঝঞ্ঝাবায়ু মুশরিকদের শিবির তছনছ করে দিল। তাঁবু উপড়ে গেল, আগুন নিভে গেল, রান্নার হাঁড়ি উল্টে গেল, পশুপাল ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ল। ভয়, বিভ্রান্তি ও হতাশায় আক্রান্ত হয়ে তারা যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হলো। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ করো, যখন শত্রুবাহিনী তোমাদের ওপর এসেছিল। তখন আমি তাদের বিরুদ্ধে এক প্রবল বায়ু এবং এমন এক বাহিনী প্রেরণ করেছিলাম, যা তোমরা দেখতে পাওনি।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৯)
খন্দকের যুদ্ধের পর কুরাইশ ও তাদের মিত্ররা আর কখনো মদিনার বিরুদ্ধে এমন বিশাল সম্মিলিত আক্রমণ চালানোর সাহস করেনি। এভাবেই নুয়াইম ইবনু মাসউদ (রা.) তাঁর ঈমান, কৌশল ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে ইসলামের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় রচনা করেন। ইতিহাসের বহু নীরব নায়কের মতো তিনিও প্রমাণ করে গেছেন—আল্লাহ যখন কাউকে তাঁর দ্বীনের সাহায্যের জন্য বেছে নেন, তখন একজন মানুষও একটি বিশাল বাহিনীর সমান প্রভাব বিস্তার করতে পারেন।