তবে গল্পটাকে আমি নিছক নগর-সমালোচনা হিসেবে পড়িনি। এর সবচেয়ে সাহসী অংশটা বোধহয় এইখানে যে, শব্দকে নিছক পদার্থবিজ্ঞানের কম্পাঙ্ক না রেখে গল্পটা সরাসরি আধ্যাত্মিকতার ভাষায় নিয়ে যায়, আর সেই ঝুঁকিটা নিতে দ্বিধা করে না। ওস্তাদ চরিত্রটা যখন বলেন আজানের শব্দ বুকের ভেতরের একটা রগ জাগিয়ে দেয়, সুরা ফাতিহা প্রতি নামাজে পড়ানো হয় যাতে বিপদের দিনে মাথা কাজ না করলেও শব্দটা নিজে থেকে বেরিয়ে আসে, নবজাতকের কানে প্রথম শব্দ হিসেবে আজান দেওয়া হয় যাতে তার “টিউনিং” শুরু হয় জন্মের প্রথম মুহূর্তেই। এই কথাগুলো আমার কাছে নিছক ধর্মীয় অনুষঙ্গ মনে হয়নি বরং মনে হয়েছে একটা স্থাপত্যের বর্ণনা, যেন শরীরের ভেতরে সত্যিই একটা নকশা করা আছে, আর শব্দ সেই নকশার চাবি।
গল্পের সবচেয়ে অস্বস্তিকর অংশটা হয়তো হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালার প্রসঙ্গ। ওস্তাদ যখন বলেন ইঁদুরের জন্য এক সুর, মানুষের জন্য আরেক সুর, একই বাঁশি দিয়ে দুই রকম ডাকা যায় তখন গল্পটা হঠাৎ আর নিছক প্রশান্তির কথা বলে না, ক্ষমতার কথা বলে। যে শব্দ সারাতে পারে, সেই শব্দই কাউকে ডেকে নিয়ে যেতে পারে, ফেরত না এনে। এই দ্বিমুখিতা শব্দের ওষুধ আর শব্দের ফাঁদ একই উৎস থেকে আসা, বোধহয় গল্পের আধ্যাত্মিক দর্শনের মূল স্তম্ভ। পবিত্রতা আর বিপদ যেন একই কম্পনের দুই পিঠ, আর গল্পটা এই দুইয়ের মধ্যে দাগ টেনে দেয় না, দিতে চায়ও না।
সবচেয়ে বড় বাঁকটা আসে যখন ওস্তাদ কোরানের সৃষ্টিতত্ত্বের কথা বলেন, ‘কুন ফায়াকুন’, হও আর হয়ে গেল এবং ইস্রাফিলের শিঙা, যিনি সৃষ্টির প্রথম দিন থেকে অনন্তকাল ধরে এক ফুঁয়ের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। প্রথম শব্দ দিয়ে শুরু, শেষ শব্দের অপেক্ষায় সমাপ্তি, আর মাঝখানের পুরো অস্তিত্বটাই যেন দুই নোটের মধ্যেকার একটা দীর্ঘ সুর। এই কথাগুলো বিজ্ঞান না, প্রমাণযোগ্য কোনো দাবি না কিন্তু একটা কাব্যিক সত্য বহন করে যা আমি উপেক্ষা করতে পারিনি। গল্পটা এই জায়গায় এসে বিজ্ঞান আর বিশ্বাসের মধ্যেকার সীমানাটা ইচ্ছাকৃতভাবেই ঝাপসা করে দেয়, আর পাঠক হিসেবে আমার কাছে সেই ঝাপসা হয়ে যাওয়াটাই বরং স্বস্তির মনে হয়েছে। সবকিছু মেপে ফেলার দরকার নেই, কিছু জিনিস শুধু অনুভব করার জন্যই রাখা থাকে।
গল্পটা শেষ পর্যন্ত কোনো সমাধান দেয় না, আর সেটাই বোধহয় এর সবচেয়ে সৎ জায়গা। ওস্তাদ অদৃশ্য হয়ে যান, রহস্যটা রহস্যই থেকে যায় আর কথক ঠিক করে ফেলেন যে তিনি অন্তত নিজের ঘরে একটা ছোট নিয়ম মেনে চলবেন, রাত বারোটার পর গান না বাজানো। একটা ব্যক্তিগত সীমানা, বিশাল কোনো দর্শনের ঘোষণা না। আমার কাছে এটাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত মনে হয়েছে। আমরা হয়তো প্রমাণ করতে পারব না চারশো বত্রিশ বনাম চারশো চল্লিশের বিতর্কে কে ঠিক, কিন্তু প্রতিদিন নিজের কানে কী ঢালছি, সেই প্রশ্নটা তোলা কারো এখতিয়ারের বাইরে না।
লেখা শেষ করার আগে একটা স্বীকারোক্তি না দিলেই না। আজ রাতে, এই লেখাটা লিখতে লিখতে আমি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম বারোটা পার হয়ে গেছে। ঘরে কোনো গান বাজছে না, শুধু কি-বোর্ডের শব্দ আর জানালার বাইরে একটা কুকুরের ডাক, বহুদূর থেকে। আশ্চর্যের কথা, নিস্তব্ধতাটা এই মুহূর্তে খারাপ লাগছে না।