বিদেশে জীবন কাটিয়ে দেশে ফেরা ৫৫ ঊর্ধ্ব প্রবাসীদের সামনে নতুন প্রশ্ন—অর্ধাহার, চিকিৎসা সংকট ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের অবদান নিয়ে আলোচনা হয় নিয়মিত। কিন্তু সেই রেমিট্যান্সের পেছনে থাকা মানুষগুলোর জীবনের শেষ অধ্যায় নিয়ে আলোচনা কতটা হয়?
বছরের পর বছর বিদেশের মাটিতে শ্রম দিয়েছেন একজন প্রবাসী। প্রচণ্ড গরম, ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপরিবেশ, পরিবার থেকে দূরে থাকা- সবকিছু মেনে মাস শেষে দেশে টাকা পাঠিয়েছেন। সেই টাকায় সন্তান পড়াশোনা করেছে, ঘর হয়েছে, জমি কেনা হয়েছে, পরিবারের চিকিৎসা হয়েছে। একই সঙ্গে তার পাঠানো অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও অর্থনীতিতেও অবদান রেখেছে।
কারও সঞ্চয় নেই। কারও সঞ্চয় সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তে শেষ হয়েছে। কেউ বিদেশে কাজ করতে গিয়ে শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়েছেন। কারও নতুন করে ব্যবসা করার মতো পুঁজি নেই। আবার বয়সের কারণে আগের মতো শ্রম দেওয়ার সক্ষমতাও নেই।
ফলে কারও দিন কাটছে সন্তান বা স্বজনের ওপর নির্ভর করে, কারও চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অর্থের অভাবে। কেউ আবার আয় না থাকায় সংসারের নিত্যপ্রয়োজন মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছেন।
রাষ্ট্রের উদ্যোগ আছে, কিন্তু প্রশ্নও আছে!
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালে ‘প্রত্যাগত অভিবাসী কর্মী পুনঃএকত্রীকরণ নীতি’ প্রণয়ন করেছে। এর মাধ্যমে দেশে ফিরে আসা অভিবাসী কর্মীদের পুনঃএকত্রীকরণ ও পুনর্বাসনের কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে প্রত্যাগত কর্মীদের রি-ইন্টিগ্রেশন, চিকিৎসা সহায়তা, প্রশিক্ষণ, সামাজিক সহায়তা ও অন্যান্য সেবা দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় RAISE প্রকল্পের মাধ্যমে ইতোমধ্যে বিপুলসংখ্যক প্রত্যাগত অভিবাসীকে নিবন্ধন, কাউন্সেলিং, নগদ সহায়তা ও প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০২৫ সালের শুরু পর্যন্ত ৩১টি জেলা কল্যাণকেন্দ্রের মাধ্যমে ১ লাখ ৪০ হাজারের বেশি প্রত্যাগত কর্মী নিবন্ধিত হয়ে বিভিন্ন সেবা পেয়েছেন।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরেও সরকার প্রত্যাগত প্রবাসীদের নতুন করে নিবন্ধন ও পুনঃএকত্রীকরণ কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।
এমনকি ২০২৬ সালের আগস্টে প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী প্রত্যাগত কর্মীদের ভাতা বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও জানিয়েছেন এবং তাদের সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন।
তবুও যে প্রশ্নটি রয়ে যায়-
এত উদ্যোগের পরও ৫৫ ঊর্ধ্ব এমন একজন প্রত্যাগত প্রবাসী, যিনি আর কাজ করতে সক্ষম নন, আয়হীন এবং অসুস্থ- তার নিয়মিত জীবনযাপনের নিশ্চয়তা কী?
পুনর্বাসনের জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়। ব্যবসার জন্য ঋণ দেওয়া যায়। কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা যায়। কিন্তু একজন ৬০ বছর বয়সী অসুস্থ মানুষের কাছে নতুন করে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করার প্রস্তাব কতটা বাস্তবসম্মত?
আইনেও অভিবাসী কর্মী ও তাদের পরিবারের জন্য ব্যাংক ঋণ, আর্থিক সহায়তা, সঞ্চয়, বিনিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও পুনঃএকত্রীকরণ কর্মসূচির সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু সামাজিক নিরাপত্তার প্রয়োজন এমন প্রত্যাগত প্রবাসী এবং নতুন করে কর্মসংস্থানে যেতে সক্ষম প্রত্যাগত প্রবাসী- দুই শ্রেণিকে কি একইভাবে দেখা উচিত?
প্রয়োজন বয়স ও সক্ষমতাভিত্তিক আলাদা কর্মসূচি-
প্রবাসীদের কল্যাণের বর্তমান কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করে ৫৫ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রত্যাগত কর্মীদের জন্য আলাদা কর্মসূচি বিবেচনা করা যেতে পারে।
যেমন—
প্রথমত, দেশে ফিরে আসা ৫৫ ঊর্ধ্ব প্রবাসীদের জাতীয় পর্যায়ে আলাদা ডাটাবেজ তৈরি।
দ্বিতীয়ত, আয়হীন ও অসহায় প্রত্যাগত প্রবাসীদের জন্য মাসিক সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা।
তৃতীয়ত, বিদেশে দীর্ঘদিন কাজ করার কারণে অসুস্থ বা কর্মক্ষমতা হারানো ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যকার্ড ও চিকিৎসা সহায়তা।
চতুর্থত, যারা ব্যবসা করতে সক্ষম তাদের জন্য ঋণের পাশাপাশি অনুদান বা সহজ শর্তে মূলধন সহায়তা।
পঞ্চমত, প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ে প্রত্যাগত প্রবাসীদের জন্য তথ্য ও সহায়তা ডেস্ক।
ষষ্ঠত, দীর্ঘদিন বিদেশে কাজ করা কর্মীদের অবসরকালীন সুরক্ষার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ‘প্রবাসী সামাজিক নিরাপত্তা তহবিল’ গঠনের বিষয়টি বিবেচনা।
রেমিট্যান্সের হিসাবের সঙ্গে রেমিট্যান্স যোদ্ধার হিসাবও কি হবে?
দেশে রেমিট্যান্স আসার পরিসংখ্যান প্রকাশ হয়। কত টাকা এসেছে, কত শতাংশ বেড়েছে—এসব নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু সেই অর্থ পাঠানো শ্রমিকটি দেশে ফিরে কেমন আছেন, তার চিকিৎসা হচ্ছে কি না, সংসারে খাবার আছে কি না, সন্তানরা পাশে আছে কি না—এই হিসাবও কি রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে থাকা উচিত নয়?
একজন প্রবাসী তার কর্মজীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী সময়টি দেশের বাইরে কাটিয়েছেন। পরিবারের জন্য যেমন দিয়েছেন, তেমনি দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রেখেছেন।
তাই কর্মক্ষমতা শেষ হয়ে গেলে তার পরিচয় যেন শুধু ‘সাবেক প্রবাসী’ হয়ে না যায়।
বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত-
যে মানুষটি জীবনের সোনালি সময়টি বিদেশে কাটিয়ে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রেখেছেন, জীবনের শেষ সময়ে রাষ্ট্র কি তার পাশে দাঁড়াবে না?
রেমিট্যান্স শুধু ডলারের হিসাব নয়; এর পেছনে আছে লাখো মানুষের শ্রম, ঘাম, বিচ্ছেদ ও ত্যাগ। সেই মানুষগুলোর বার্ধক্য ও সামাজিক নিরাপত্তার হিসাবও রাষ্ট্রীয় নীতিতে জায়গা পাওয়ার দাবি রাখে।