রাইমা ইসলাম শিমুর অভিনয়জীবন শুরু হয়েছিল মঞ্চনাটকের মাধ্যমে। পরে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত পরিচালক কাজী হায়াতের নজরে আসেন তিনি।রাইমার অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে কাজী হায়াত তাকে ‘বর্তমান’ সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ দেন।১৯৯৮ সালে সিনেমাটি মুক্তির মধ্য দিয়ে বড় পর্দায় অভিষেক হয় তার।
বিয়ের পর সিনেমায় অভিনয় থেকে কিছুটা দূরে সরে গেলেও টেলিভিশনে কাজ চালিয়ে যান রাইমা। কয়েকটি অনুষ্ঠান প্রযোজনা করেন এবং নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানও গড়ে তোলেন।
এ ছাড়া একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের বিপণন বিভাগেও কাজ করেছিলেন তিনি।
রাইমা ও শাখাওয়াতের দুই সন্তান ছিল। পরিবার নিয়ে ঢাকার গ্রিন রোড এলাকায় থাকতেন তারা।
২০২২ সালের ১৬ জানুয়ারি ছিল রবিবার। শাখাওয়াতের ভাষ্য অনুযায়ী, সকাল ৭টার দিকে শুটিংয়ে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হন রাইমা।
কিন্তু তিনি শুটিংয়ের জায়গায় পৌঁছাননি।
রাইমার বোন ফাতিমা নিশা বার বার তার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে তিনি শাখাওয়াতকে ফোন করে জানতে চান, রাইমা কোথায়।
শাখাওয়াত জানান, রাইমা শুটিংয়ে যাওয়ার জন্য সকাল ৭টার দিকে বের হয়েছেন। কিন্তু এরপর তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
সেদিন রাতে রাইমা বাসায় ফিরে না আসায় উদ্বেগ আরো বাড়ে।
পরদিন ১৭ জানুয়ারি সকালে ফাতিমা থানায় গিয়ে রাইমার নিখোঁজের অভিযোগ করেন। পরে শাখাওয়াতও কলাবাগান থানায় অভিযোগ করেন।
তখনো পরিবারের ধারণা ছিল, রাইমা হয়তো কোথাও নিখোঁজ হয়েছেন।
কিন্তু একই দিন কেরানীগঞ্জ থেকে আসে ভয়ংকর খবর।
কেরানীগঞ্জের হযরতপুর সেতুর কাছে ঝোপের মধ্যে একটি সন্দেহজনক বস্তা দেখতে পান স্থানীয় বাসিন্দারা। বিষয়টি পুলিশকে জানানো হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়।
বস্তা খুলে ভেতরে এক নারীর মরদেহ পাওয়া যায়। মরদেহটি দুই টুকরো করা ছিল এবং শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন ছিল।
মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মিটফোর্ড হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে রাইমার ভাই শহিদুল ইসলাম মরদেহটি শনাক্ত করেন।
এরপর নিখোঁজের সাধারণ অভিযোগ বদলে যায় হত্যাকাণ্ডের মামলায়।
তদন্তের শুরুতে রাইমার পরিচিতজন ও সহকর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এ সময় অভিনেতা জায়েদ খানের নামও সামনে আসে।
জানা যায়, চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সদস্যপদ নিয়ে কয়েক বছর আগে রাইমা ও জায়েদ খানের মধ্যে বিরোধ হয়েছিল।
এই পুরনো বিরোধের বিষয়টি জানতে পুলিশ জায়েদ খানকে জিজ্ঞাসাবাদ করে।
জায়েদ জানান, প্রায় দুই বছর আগে রাইমার সঙ্গে তার শেষ কথা হয়েছিল। এরপর তাদের মধ্যে আর যোগাযোগ ছিল না।
পরে এই সূত্রে তদন্ত আর এগোয়নি।
এরপর তদন্তকারীরা রাইমার পরিবার ও তার বাসার লোকজনের ওপর বেশি গুরুত্ব দেন।
রাইমা ও তার স্বামী দুজনেই যে পরিবারের গাড়িটি ব্যবহার করতেন, সেটি পরীক্ষা করে পুলিশ।
গাড়ির ভেতরে গিয়ে তদন্তকারীরা তীব্র ব্লিচের গন্ধ পান। এতে তাদের সন্দেহ হয়, গাড়ির ভেতর কোনো কিছু পরিষ্কার করে আলামত মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে।
এরপর গাড়ির ভেতর থেকে নাইলনের দড়ির একটি বান্ডিল পাওয়া যায়।
রাইমার মরদেহ যে বস্তায় পাওয়া গিয়েছিল, সেটিও নাইলনের দড়ি দিয়ে সেলাই করে বন্ধ করা ছিল।
এই দুটি বিষয় তদন্তকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাদের ধারণা হয়, রাইমার মরদেহ বাসা থেকে কেরানীগঞ্জে নিয়ে যাওয়ার কাজে পরিবারের গাড়িটি ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।
তদন্তের একপর্যায়ে পুলিশ ছয়জনকে আটক করে। তাদের মধ্যে ছিলেন রাইমার স্বামী শাখাওয়াত আলী নোবেল এবং তার বন্ধু এসএমওয়াই আবদুল্লাহ ফরহাদ।
তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য, জিজ্ঞাসাবাদের শুরুতে শাখাওয়াত ১৬ জানুয়ারি সকালে কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে একাধিক ভিন্ন বক্তব্য দেন।
পরে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তিনি স্ত্রীকে হত্যার কথা স্বীকার করেন বলে পুলিশ জানায়।
তদন্তকারীদের দাবি, রাইমা সেদিন আসলে শুটিংয়ে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে বের হননি।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৬ জানুয়ারি সকাল ৭টার দিকে রাইমা ও শাখাওয়াতের মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়।
একপর্যায়ে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়। পুলিশের ভাষ্য, শাখাওয়াত রাইমাকে মারধর করেন এবং পরে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন।
এরপর তিনি তার বন্ধু ফরহাদকে বাসায় ডাকেন বলে পুলিশ জানায়।
সেসময় বাসায় পরিবারের একজন গৃহকর্মীও ছিলেন। তদন্তকারীদের দাবি, তাকে নাশতা কিনতে বাইরে পাঠানো হয়।
গৃহকর্মী বাইরে যাওয়ার পর শাখাওয়াত ও ফরহাদ মিলে রাইমার মরদেহ গোপন করার পরিকল্পনা করেন বলে পুলিশের অভিযোগ।
তারা মরদেহ দুই টুকরো করে একটি বস্তায় রাখেন। পরে নাইলনের দড়ি দিয়ে বস্তাটি শক্ত করে বন্ধ করা হয়।
এরপর বস্তাটি পরিবারের গাড়ির ডিকিতে রাখা হয় বলে তদন্তে দাবি করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য, ওই দিন বিকেলে শাখাওয়াত ও ফারহাদ মরদেহ ফেলে দেওয়ার উদ্দেশ্যে গাড়ি নিয়ে বের হন।
কিন্তু তখনো দিনের আলো ছিল। লোকজন দেখে ফেলতে পারে—এই আশঙ্কায় তারা পরিকল্পনা বাতিল করে বাসায় ফিরে আসেন।
বস্তাটি তখনো গাড়ির ভেতরে ছিল।
রাত প্রায় ৯টার দিকে তারা আবার গাড়ি নিয়ে বের হন। এবার তারা কেরানীগঞ্জের দিকে যান।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হযরতপুর সেতুর কাছে একটি নির্জন জায়গা খুঁজে তারা গাড়ি থামান। সেতু থেকে প্রায় ৩০০ মিটার দূরে ঝোপের মধ্যে বস্তাটি ফেলে রেখে তারা ঢাকায় ফিরে আসেন।
পরদিন সকালে শাখাওয়াত থানায় গিয়ে স্ত্রী নিখোঁজ হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন।
কিন্তু এরই মধ্যে স্থানীয়রা সেই বস্তা খুঁজে পান এবং পুলিশকে খবর দেন।
তদন্তের সময় রাইমা ও শাখাওয়াতের দাম্পত্যজীবন নিয়েও নানা তথ্য সামনে আসে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শাখাওয়াত রাইমাকে নিয়ে সন্দেহ করতেন। তিনি রাইমার বিরুদ্ধে পরকীয়ার অভিযোগও করতেন বলে তদন্তে উঠে আসে।
রাইমাকে মারধর করার অভিযোগও ছিল তার বিরুদ্ধে।
করোনাভাইরাস মহামারির সময় তাদের পারিবারিক আর্থিক সমস্যাও বেড়ে যায়। শুটিং বন্ধ থাকায় রাইমার কাজ কমে যায়। অন্যদিকে শাখাওয়াতের ব্যবসাতেও আর্থিক ক্ষতি হয় বলে জানা যায়।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর রাইমাই পরিবারের প্রধান উপার্জনকারীদের একজন হয়ে ওঠেন। আর্থিক চাপের পাশাপাশি তাদের দাম্পত্য কলহও বাড়তে থাকে বলে তদন্তে উঠে আসে।
মৃত্যুর কয়েক মাস আগে রাইমা স্বামীর বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগ করেছিলেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তিনি তার বোন ফাতিমা নিশার সঙ্গে দাম্পত্যজীবনের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কথা বলতেন।
হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ রাইমা ও শাখাওয়াতের মেয়েকেও জিজ্ঞাসাবাদ করে। তদন্তকারীদের কাছে সে জানায়, তার বাবা প্রায়ই তার মাকে মারধর করতেন। পুলিশের কাছে হত্যার কথা স্বীকার করার পর শাখাওয়াত পুলিশ হেফাজত থেকে মেয়েকে ফোন করেছিলেন বলেও জানা যায়।
মেয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, ফোনে শাখাওয়াত তার মাকে হত্যার জন্য ক্ষমা চান।
রাইমা শিমু নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথমে মনে হয়েছিল, তিনি হয়তো শুটিংয়ে যাওয়ার পথে কোথাও নিখোঁজ হয়েছেন। তার পরিবারও সেই তথ্যের ভিত্তিতেই পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছিল।
কিন্তু তদন্ত যত এগোয়, ততই সামনে আসতে থাকে ভিন্ন চিত্র।
পরিবারের গাড়িতে ব্লিচের গন্ধ, নাইলনের দড়ি এবং গাড়ির গতিবিধি তদন্তকারীদের সন্দেহ বাড়িয়ে দেয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদে শিমুর স্বামী ও তার বন্ধুকে ঘিরে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ সামনে আসে।
একজন অভিনেত্রী হিসেবে দীর্ঘদিন মঞ্চ, সিনেমা ও টেলিভিশনে কাজ করেছেন রাইমা শিমু। কিন্তু ২০২২ সালের জানুয়ারিতে তার নিখোঁজ হওয়া এবং পরদিন দুই টুকরো মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা তার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায় হয়ে থেকে যায়।