আগে সালাম দেওয়া : মানুষের মধ্যে ভালোবাসা ছড়িয়ে দেওয়া এবং হৃদয়ের বন্ধন দৃঢ় করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো সালাম প্রচার করা।আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না যতক্ষণ না তোমরা ঈমান আনো, আর তোমরা ঈমানদার হতে পারবে না যতক্ষণ না তোমরা একে অন্যকে ভালোবাসো। আমি কি তোমাদের এমন একটি কাজের কথা বলব না, যা করলে তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টি হবে? তোমরা পরস্পরের মধ্যে সালাম প্রচার করো।’ (মুসলিম, আস-সহিহ, ৫৪)
নবীজি (সা.) কাউকে কাউকে পরিস্থিতি ও প্রাসঙ্গিক হিসেবে ডাকনাম দিতেন এবং সেই নামে ডাকতেন।এতে তাঁদের মর্যাদা বৃদ্ধি হতো, কারো কারো অবস্থান উচ্চতর হতো এবং সমাজে কারো গুরুত্ব ও মূল্যবোধ অনুভব হতো। আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ (রা.)-কে তিনি বলতেন ‘উম্মাহর আমানতদার’। (বুখারি, আস-সহিহ, ৩৭৪৪)
নাম ধরে না ডেকে তার অবস্থান অনুযায়ী ডাক্তার বা শায়েখ বা শিক্ষক ইত্যাদি বলে সম্বোধন করলে সে সম্মানিত বোধ করে। এতে মানুষের অন্তরে ভালোবাসা সৃষ্টি হয় এবং সম্পর্ক আরো আন্তরিক ও দৃঢ় হয়।
এ ধরনের আচরণ মানুষের প্রতি তাঁর গভীর মনোযোগ, সম্মান ও ভালোবাসার উজ্জ্বল নিদর্শন।
আলাপ ও হাস্যরস করা : নবীজি (সা.) সাহাবিদের সঙ্গে তাঁদের কথাবার্তায় অংশ নিতেন, এমনকি সেই আলোচনাগুলো যদি জাহিলিয়াত যুগের বিষয় সম্পর্কেও হতো। তিনি তাঁদের সঙ্গে কথোপকথনে যুক্ত হতেন এবং তাঁদের সঙ্গে হাসতেন। এতে তাঁদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পেত। সিমাক ইবনু হারব বলেন, ‘আমি জাবির ইবনু সামুরা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে বসতেন?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, অনেকবার। তিনি ফজরের সালাতের পর যে স্থানে সালাত আদায় করতেন, সেখানেই সূর্য ওঠা পর্যন্ত বসে থাকতেন। এরপর সূর্য উঠলে উঠতেন। এ সময় সাহাবিরা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন, এমনকি জাহিলিয়াতের ঘটনাও তুলতেন, তখন তারা হাসতেন আর নবীজি (সা.) মুচকি হাসতেন।’ (মুসলিম, আস-সহিহ, ৬৭০)
হাসিঠাট্টা করা পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব, আন্তরিকতা ও সম্পর্কের দৃঢ়তার প্রকাশ করে। নবীজিও তাঁর সাহাবিদের সঙ্গে হাস্যরস করতেন, যা তাঁদের প্রতি তাঁর ভালোবাসারই নিদর্শন। আনাস ইবনু মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) তাঁকে স্নেহভরে ‘ইয়া জা-উযনাইন’ অর্থাৎ ‘হে দুই কানওয়ালা’ বলে সম্বোধন করতেন অর্থাৎ মজার ছলে ডাকতেন। (আহমদ, আল-মুসনাদ, ১২১৬৪)
তবে অতিরিক্ত ঠাট্টা-বিদ্রুপ হৃদয়কে কঠিন করে এবং ব্যক্তিত্বের মর্যাদা কমিয়ে দেয়। পাশাপাশি এতে মিথ্যা, উপহাস বা কাউকে ছোট করার কিছু থাকা যাবে না।
সাধ্যমতো প্রয়োজন পূরণ ও সহযোগিতা করা : মানুষের কাজে সাহায্য-সহযোগিতা করা অত্যন্ত মহৎ কাজ। যেমন—কাউকে ভারী বোঝা বহন করতে দেখলে তাকে সাহায্য করা বা কাউকে কঠিন কাজে সহায়তা করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) এসব কাজকে সদকা হিসেবে গণ্য করেছেন, যাতে মানুষ এতে উৎসাহিত হয়। তিনি বলেছেন, ‘মানুষের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ওপর প্রতিদিন সদকা করা কর্তব্য।’ (মুসলিম, আস-সহিহ, ২২০৭)
নবীজি (সা.) সাহাবিদের প্রয়োজন পূরণ করতেন। উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘কোন আমল সবচেয়ে উত্তম?’ তিনি বলেন, ‘তুমি কোনো মুমিনের অন্তরে আনন্দ প্রবেশ করিয়ে ক্ষুধা নিবারণ করো, তাকে পোশাক দাও অথবা তার কোনো প্রয়োজন পূরণ করে দাও।’ (আল-বায়হাকি, শুয়াবুল ঈমান, ৭২৭৪)
নম্রতা অবলম্বন ও রূঢ়তা উপেক্ষা করা : নম্রতা মানুষের ভালোবাসা অর্জনের সবচেয়ে সহজ পথগুলোর একটি। এটি মানুষের হৃদয়ে বিশেষ স্থান তৈরি করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন সবচেয়ে বেশি নম্র ও বিনয়ী। আবু মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি নবীজি (সা.)-এর সামনে এসে কথা বলতে গিয়ে ভয়ে কাঁপতে লাগল। তখন তিনি বললেন, ‘ভয় পেয়ো না, আমি কোনো রাজা নই; আমি তো একজন সাধারণ নারীর সন্তান, যিনি শুকনা মাংস খেতেন।’ (ইবন মাজাহ, আস-সুনান, ৩৩২২)
অন্যদিকে কখনো কেউ রাগের মাথায় কঠোর কথা বলতে পারে বা এমন কিছু বলতে পারে যা কষ্ট দেয়। এমন অবস্থায় উত্তম চরিত্রের পরিচয় হলো তা উপেক্ষা করা এবং তার জন্য যথাসম্ভব ভালো ব্যাখ্যা খোঁজা। এতে সম্পর্ক রক্ষা পায় এবং হৃদয়ে বিদ্বেষ জমে না। নবীজি (সা.)-ও মানুষের রূঢ় আচরণের প্রতি ধৈর্য ধারণ করতেন। এক বেদুইন তাঁর জামার প্রান্ত ধরে এত জোরে টেনেছিল যে তাঁর গলায় দাগ পড়ে যায়; তবু তিনি হাসলেন এবং তাকে কিছু দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। (বুখারি, আস-সহিহ, ৫৮০৯)
অনুপস্থিতিতে খোঁজখবর রাখা : বন্ধু বা পরিচিত কেউ অনুপস্থিত থাকলে তার খোঁজ নেওয়া, তার অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা মানুষের ভালোবাসা অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। নবীজি (সা.) সাহাবিদের অনুপস্থিতি লক্ষ করতেন এবং তাঁদের খোঁজ নিতেন। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি একবার সাবিত ইবনু কায়েস (রা.)-এর খোঁজ করলেন। জানা গেল, তিনি মন খারাপ করে ঘরে বসে আছেন। কারণ তিনি মনে করেছিলেন, নবীর সামনে উচ্চৈঃস্বরে কথা বলার কারণে তাঁর আমল নষ্ট হয়ে গেছে। (বুখারি, আস-সহিহ, ৩৬২৩)
এ ছাড়া তিনি আনসারদের খোঁজখবর রাখতেন, অসুস্থদের দেখতে যেতেন এবং তাদের অবস্থার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করতেন। এক কৃষ্ণাঙ্গ নারী, যিনি মসজিদ পরিষ্কার করতেন, তাঁর মৃত্যুর পর নবীজি (সা.) তাঁর খোঁজ করে জানতে চান এবং তাঁর কবরের কাছে গিয়ে জানাজা আদায় করেন। (মুসলিম, আস-সহিহ, ৯৫৬)
এসব ঘটনা প্রমাণ করে, মানুষের খোঁজখবর নেওয়া এবং তাদের পাশে থাকা সম্পর্ককে গভীর ও আন্তরিক করে তোলে।