আল্লাহ তাআলা হজরত সুলাইমান (আ.)-কে এমন এক রাজত্ব দান করেছিলেন, যা ছিল তাঁর যুগে অনন্য।মানুষ, জিন ও পাখিরাও তাঁর অধীনস্থ ছিল। একদিন তিনি পাখিদের পরিদর্শন করতে গিয়ে হুদহুদকে অনুপস্থিত দেখতে পেলেন।কিছুক্ষণ পর হুদহুদ ফিরে এসে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ জানাল। সে বলল, সে সাবা থেকে এমন সংবাদ নিয়ে এসেছে, যা সুলাইমান (আ.) জানতেন না।
সুলাইমান (আ.)-এর চিঠি
সুলাইমান (আ.) হুদহুদের হাতে একটি চিঠি দিয়ে সাবার শাসকের কাছে পাঠালেন। চিঠিতে লেখা ছিল, ‘পরম করুণাময়, অতি দয়ালু আল্লাহর নামে। তোমরা আমার বিরুদ্ধে অহংকার করো না এবং আত্মসমর্পণ করে আমার কাছে উপস্থিত হও।’ (সুরা : নামল, আয়াত : ৩০-৩১)
চিঠিটি পেয়ে রানি বিলকিস তার সভাসদদের ডেকে পরামর্শ চাইলেন। তিনি বললেন, তিনি একটি সম্মানিত পত্র পেয়েছেন, যা সুলাইমানের পক্ষ থেকে এসেছে। সভাসদরা জানালেন, তাদের শক্তিশালী সৈন্যবাহিনী রয়েছে এবং যুদ্ধের সামর্থ্যও আছে। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রানি নিজেই নেবেন। বিলকিস তখন যুদ্ধের পরিবর্তে বিচক্ষণ কূটনৈতিক পথ বেছে নিলেন। তিনি বললেন, রাজারা যখন কোনো জনপদে প্রবেশ করে, তখন সাধারণত তা বিপর্যস্ত করে এবং সম্মানিত মানুষদের অপমানিত করে। তাই তিনি সুলাইমান (আ.)-এর কাছে উপহার পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন—দেখবেন, দূতেরা কী সংবাদ নিয়ে ফিরে আসে।
সম্পদ দিয়ে সত্যকে কেনা যায় না
রানির পাঠানো উপহার সুলাইমান (আ.)-এর কাছে পৌঁছালে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করলেন। বললেন, ‘তোমরা কি আমাকে ধন-সম্পদ দিয়ে সাহায্য করতে চাও? আল্লাহ আমাকে যা দিয়েছেন, তা তোমাদের দেওয়া উপহারের চেয়ে উত্তম।’ (সুরা : নামল, আয়াত : ৩৬)
এরপর তিনি তাদের উপহার ফিরিয়ে দিয়ে সতর্ক করলেন। এই ঘটনায় সুলাইমান (আ.)-এর চরিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রকাশ পায়। তাঁর কাছে রাজত্ব ও সম্পদ কোনো লক্ষ্য ছিল না। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করা।
মুহূর্তের মধ্যে সিংহাসন উপস্থিত
এরপর সুলাইমান (আ.) জানতে চাইলেন, বিলকিস আত্মসমর্পণ করে তাঁর কাছে আসার আগেই কে তার সিংহাসন এনে দিতে পারে। এক শক্তিশালী জিন বলল, তিনি তাঁর মজলিস থেকে ওঠার আগেই সিংহাসন এনে দিতে পারবেন। কিন্তু কিতাবের জ্ঞানপ্রাপ্ত একজন ব্যক্তি বললেন, তিনি চোখের পলক ফেলার আগেই তা এনে দিতে পারবেন। অতঃপর সুলাইমান (আ.) মুহূর্তের মধ্যেই সেই সিংহাসন নিজের সামনে উপস্থিত দেখতে পেলেন। এ দৃশ্য দেখে তিনি অহংকারে আত্মহারা হননি। বরং সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘এ আমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ, যাতে তিনি আমাকে পরীক্ষা করেন—আমি কৃতজ্ঞ হই, নাকি অকৃতজ্ঞ।’ (সুরা : নামল, আয়াত : ৪০)
রাণী বিলকিসের সিংহাসনের পরীক্ষা
সুলাইমান (আ.) বললেন, বিলকিসের সিংহাসনের আকৃতি কিছুটা পরিবর্তন করে দিতে। এরপর দেখা হবে, তিনি সেটিকে চিনতে পারেন কি না। বিলকিস যখন সুলাইমান (আ.)-এর দরবারে এলেন, তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘তোমার সিংহাসন কি এরূপ?’ তিনি সরাসরি অস্বীকারও করলেন না, আবার নিশ্চিতভাবেও বললেন না যে এটিই তাঁর সিংহাসন। তিনি বিচক্ষণতার সঙ্গে উত্তর দিলেন, ‘এ তো সেটির মতোই মনে হচ্ছে।’ (সুরা : নামল, আয়াত : ৪২)
এর মধ্য দিয়ে তার বুদ্ধিমত্তা ও সতর্কতার পরিচয় পাওয়া যায়।
কাচের প্রাসাদে বিস্ময়
এরপর বিলকিসকে প্রাসাদে প্রবেশ করতে বলা হলো। প্রাসাদের মেঝে ছিল স্বচ্ছ কাচের। দূর থেকে দেখে তার মনে হলো, সেখানে যেন পানি প্রবাহিত হচ্ছে। তিনি পানি থেকে বাঁচার জন্য তাঁর পায়ের কাপড় উঠিয়ে নিলেন। তখন সুলাইমান (আ.) জানালেন, এটি পানি নয়; এটি স্বচ্ছ কাচের তৈরি প্রাসাদ। এই বিস্ময়কর দৃশ্য, সুলাইমান (আ.)-এর নবুয়ত এবং আল্লাহর প্রদত্ত নিদর্শনগুলো বিলকিসের সামনে সত্যকে আরও স্পষ্ট করে তুলল।
অবশেষে বিলকিস নিজের পূর্বের অবস্থান থেকে ফিরে এলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, আসল ক্ষমতার মালিক কোনো রাজা বা রানি নন; বরং সমগ্র বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ। তিনি ঘোষণা করলেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমি তো নিজের প্রতি জুলুম করেছি। আর আমি সুলাইমানের সঙ্গে বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করছি।’ (সুরা : নামল, আয়াত : ৪৪)
এভাবেই একজন শক্তিশালী রাজ্যের অধিকারী নারী শাসকের জীবনে ঘটল সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। তিনি রাজত্ব হারালেন না; বরং তার চেয়েও মূল্যবান কিছু অর্জন করলেন—ঈমান ও তাওহিদ।
সুলাইমান (আ.)-এর রাজত্ব ছিল বিস্ময়কর, বিলকিসের সাম্রাজ্য ছিল বিশাল; কিন্তু কোরআন তাদের গল্পকে রাজত্বের প্রতিযোগিতা হিসেবে উপস্থাপন করেনি। বরং দেখিয়েছে—মানুষ যত শক্তিশালীই হোক, সত্যের সামনে তার মাথা নত করাই প্রকৃত সফলতা।