টোকিওর আকাবানে এলাকার কিরিগাওয়াকা এলাকায় বসবাসরত বাংলাদেশি ব্যবসায়ী আলতাফ কাশেম কালের কণ্ঠকে বলেন, ওই এলাকায় একটি বাংলা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার বাস্তব প্রয়োজন তৈরি হয়েছে। শুধু ওই এলাকাতেই ৭০টির বেশি বাংলাদেশি পরিবার বসবাস করে।এসব পরিবারের অধিকাংশের দুটি করে সন্তান রয়েছে। তাদের হিসাবে, পরিবারগুলোর মধ্যে ১০ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যা প্রায় ১০০ থেকে ১৫০।
আলতাফ কাশেম বলেন, ‘আমাদের সন্তানরা জাপানে জন্ম নিচ্ছে, এখানেই বড় হচ্ছে এবং জাপানি স্কুলে পড়াশোনা করছে। এতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। বরং তারা জাপানের ভাষা ও শিক্ষায় দক্ষ হয়ে উঠুক, সেটিই আমরা চাই। কিন্তু একই সঙ্গে তারা যেন বাংলা ভাষা, বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কেও জানতে পারে, সেটিও জরুরি।’
তিনি বলেন, ‘আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল স্কুলসহ আন্তর্জাতিক মানের কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার খরচ অনেক বেশি। সাধারণ বাংলাদেশি পরিবারের পক্ষে সেই ব্যয় বহন করা সহজ নয়। তাই আমরা চাই, বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা বোর্ডের অধীনে টোকিওতে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হোক। সেখানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনার ব্যবস্থা থাকবে।’
এ ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে শিশুরা জাপানের শিক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি বাংলা ভাষা, বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি শেখার সুযোগ পাবে বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, ভবিষ্যতে শিশুরা যে দেশেই থাকুক, নিজেদের পরিচয় ও শিকড় সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন।
আলতাফ কাশেম আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় প্রবাসী বাংলাদেশিদের সন্তানদের বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এখন সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানাচ্ছে প্রবাসী কমিউনিটি।
পারিবারিক বন্ধন নিয়েও উদ্বেগ
জাপানে ২৩ বছর ধরে বসবাস করছেন সাঈদ সিদ্দিকী। তার মতে, প্রবাসে বেড়ে ওঠা শিশুদের শুধু বাংলা ভাষা শেখানো নয়, বাংলাদেশের পারিবারিক মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত করাও জরুরি।
সাঈদ সিদ্দিকী বলেন, ‘জাপানে বড় হওয়া শিশুদের জীবনযাপন ও পারিবারিক সম্পর্কের ধরন আমাদের দেশের তুলনায় অনেকটাই আলাদা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে সন্তানদের সঙ্গে বাবা-মায়ের দূরত্ব তৈরি হয়। আমরা চাই, আমাদের সন্তানরা জাপানের শিক্ষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের পারিবারিক বন্ধন, শ্রদ্ধাবোধ ও মূল্যবোধ সম্পর্কেও জানুক।’
তিনি বলেন, শিশুদের ছোটবেলা থেকেই বাবা-মা, পরিবারের অন্য সদস্য এবং আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্ব শেখানো প্রয়োজন। একটি বাংলা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। সেখানে পাঠদানের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক চর্চা, জাতীয় দিবস পালন, বাংলা সাহিত্য ও ইতিহাস শেখানোর ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।
জাপানি শিক্ষার পাশাপাশি বাংলা শেখার সুযোগ চান অভিভাবকেরা
জাপানে বসবাসরত বাংলাদেশি আব্দুল্লাহ আল মামুনও মনে করেন, সন্তানদের জাপানি শিক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি শেখার সুযোগ থাকা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘আমরা জাপানের শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্প চাই না। আমাদের সন্তানরা জাপানি ভাষা শিখবে, জাপানের শিক্ষাক্রম অনুযায়ী পড়াশোনা করবে—সেই সুযোগ তো তাদের থাকছেই। কিন্তু পাশাপাশি তারা যেন বাংলা ভাষা, বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও কৃষ্টি-সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারে, সেটিই আমাদের প্রত্যাশা।’
আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, বর্তমানে অভিভাবকেরা নিজেদের উদ্যোগে সন্তানদের বাংলা শেখানোর চেষ্টা করছেন। এ জন্য বাংলাদেশের শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাংলা ও আরবি শেখানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে এভাবে সীমিত পরিসরে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন।
তিনি বলেন, ‘তৃতীয় শ্রেণির পর বাংলা শেখার সুযোগও সীমিত হয়ে যায়। বাকি পড়াশোনা জাপানি শিক্ষাক্রমেই হয়। তাই আমরা চাই, জাপানে পড়াশোনার পাশাপাশি বাংলাদেশের শিক্ষা বোর্ডের অধীনে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি শেখার একটি প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ তৈরি হোক। আমাদের সন্তানরা যেন জাপানে বড় হলেও বাংলাদেশের শিকড় ও পরিচয় ভুলে না যায়।’
শুধু ভাষা নয়, পরিচয় রক্ষারও উদ্যোগ
প্রবাসীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জাপানে প্রায় ৬০ হাজার বাংলাদেশি বসবাস করেন। তাদের একটি অংশ পরিবার নিয়ে স্থায়ীভাবে বা দীর্ঘ মেয়াদে দেশটিতে বসবাস করছেন। ফলে জাপানে জন্ম নেওয়া ও বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের সঙ্গে বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের সংস্কৃতির সংযোগ ধরে রাখার বিষয়টি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের দাবি, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে। জাপানেও বাংলাদেশি পরিবারের সন্তানদের জন্য একই ধরনের সুযোগ তৈরির বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।
তবে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের শিক্ষা বোর্ডের স্বীকৃতি, জাপানের স্থানীয় শিক্ষা ও প্রশাসনিক বিধিবিধান, শিক্ষাক্রম, শিক্ষক নিয়োগ এবং অর্থায়নের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। প্রবাসীরা মনে করেন, দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগে এসব বিষয়ে সমাধান করা সম্ভব।
জাপানের সেন্ট লুক’স ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির এপিডেমিওলজি বিভাগের অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের জন্য বাংলা ভাষা শেখার সুযোগ তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাপানের শিক্ষাব্যবস্থায় পড়াশোনা করে শিশুরা জাপানি ভাষা ও সংস্কৃতিতে দক্ষ হয়ে উঠবে, যা তাদের ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক। তবে একই সঙ্গে তাদের মাতৃভাষা বাংলা, বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গেও পরিচয় থাকা প্রয়োজন।
অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি নিজের শিকড় ও পরিচয় ধারণের অন্যতম উপায়।’
তিনি আরো বলেন, জাপানে বসবাসরত বাংলাদেশি অভিভাবক, কমিউনিটি সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সমন্বিত উদ্যোগে শিশুদের বাংলা শেখানোর কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার। এতে নতুন প্রজন্ম একদিকে জাপানের সমাজে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে, অন্যদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সাংস্কৃতিক ও আত্মিক সম্পর্কও অটুট থাকবে। দুই ভাষা ও দুই সংস্কৃতির এই সমন্বয় তাদের ভবিষ্যৎকে আরো সমৃদ্ধ করবে।