বুকে সংক্রমণ, মূত্রনালির সংক্রমণ কিংবা কয়েক দিন ধরে চলা জ্বর—এসব সমস্যা অনেকেরই হয় এবং যথাযথ চিকিৎসায় অধিকাংশ মানুষ সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে কখনো কখনো সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীরের প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। তখন সংক্রমণ শুধু আক্রান্ত অঙ্গের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলতে পারে। এ অবস্থাই সেপসিসে রূপ নিতে পারে, যা দ্রুত প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
প্রথমে বোঝাই যায়নি গুরুতর পরিস্থিতি
ডা. চ্যাটার্জি এমন এক রোগীর কথা উল্লেখ করেন, যিনি জ্বর, দ্রুত হৃদস্পন্দন এবং কিডনির সংক্রমণের মতো উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে এসেছিলেন। পরীক্ষায় মূত্রের সংক্রমণ ধরা পড়ে এবং চিকিৎসাও শুরু হয়। কিন্তু চিকিৎসার পরও তার অবস্থার উন্নতি হয়নি। বরং হৃদস্পন্দন আরও বেড়ে যায় এবং রক্তচাপ কমতে শুরু করে।
পরে প্রাথমিক রোগনির্ণয় নিয়ে নতুন করে ভাবা হলে পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র সামনে আসে। সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়েছিল এবং রোগীর শরীরে গুরুতর প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছিল। অর্থাৎ কিডনির সংক্রমণ ছিল ঠিকই, কিন্তু সেটিই পুরো সমস্যার কারণ ছিল না।
ডা. চ্যাটার্জির মতে, এ ঘটনা চিকিৎসকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা। কোনো রোগীর চিকিৎসা চলার পরও অবস্থার অবনতি হলে প্রাথমিক রোগনির্ণয় পুনর্বিবেচনা করতে হবে এবং সংক্রমণের জটিলতা কিংবা অন্য কোনো সংক্রমণের উৎস আছে কি না, তা খুঁজে দেখতে হবে।
যেসব লক্ষণে সতর্ক হতে হবে
ডা. চ্যাটার্জি বলেন, শুরুতেই সেপসিস সবসময় নাটকীয় লক্ষণ নিয়ে দেখা দেয় না। অনেক সময় সাধারণ সংক্রমণ ভালো না হওয়ার মতো উপসর্গ দিয়েই শুরু হয়। তবে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি—
বিশেষ করে এসব লক্ষণ একসঙ্গে দেখা দিলে কিংবা আগে থেকেই সংক্রমণে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির অবস্থার হঠাৎ অবনতি হলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে
সব মানুষের ক্ষেত্রে গুরুতর সংক্রমণ বা সেপসিসের ঝুঁকি সমান নয়। নবজাতক, বয়স্ক ব্যক্তি এবং ডায়াবেটিস বা কিডনি রোগের মতো দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিরা বেশি ঝুঁকিতে থাকতে পারেন। রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমিয়ে দেয় এমন ওষুধ সেবনকারীদেরও গুরুতর সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি।
ভারত-বাংলাদেশের মতো দেশে ডেঙ্গু, স্ক্রাব টাইফাস ও লেপ্টোস্পাইরোসিসের মতো সংক্রমণও গুরুতর অসুস্থতার কারণ হতে পারে। রোগীর উপসর্গ, অবস্থান ও সংক্রমণের সম্ভাব্য উৎস বিবেচনায় এসব রোগের বিষয়ও চিকিৎসকদের মাথায় রাখতে হয়।
চিকিৎসকের মতে, সেপসিস কোনো নির্দিষ্ট অঙ্গ বা নির্দিষ্ট ধরনের সংক্রমণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণ থেকেই এটি হতে পারে।
চিকিৎসার পরও অবস্থা খারাপ হলে
সংক্রমণের চিকিৎসা চলার পরও রোগীর অবস্থার অবনতি হওয়া অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। আক্রান্ত ব্যক্তি যদি ক্রমেই শ্বাসকষ্টে ভোগেন, বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন, অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব দেখা দেয়, অতিরিক্ত দুর্বল হয়ে পড়েন, রক্তচাপ কমে যায় কিংবা প্রস্রাবের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, তাহলে এটিকে সংক্রমণের স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
এ ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গিয়ে নতুন করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে। কারণ অসুস্থতার শুরুতে যে রোগনির্ণয় করা হয়েছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত সঠিক থাকবে—এমনটা নয়। রোগীর শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন হলে রোগনির্ণয় ও চিকিৎসা পরিকল্পনাতেও পরিবর্তন আনার প্রয়োজন হতে পারে।
দ্রুত শনাক্ত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
সেপসিসের ক্ষেত্রে দ্রুত শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা রোগীর পরিণতিতে বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে। সংক্রমণের ধরন ও রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে অ্যান্টিবায়োটিক, শিরায় তরল, অক্সিজেন, নিবিড় পর্যবেক্ষণসহ বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হতে পারে। গুরুতর অবস্থায় অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যকারিতা বজায় রাখতে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
ডা. চ্যাটার্জির মতে, সেপসিসের ক্ষেত্রে চিকিৎসা নিতে দেরি করাই বড় সমস্যাগুলোর একটি। জ্বর কমে কি না তা দেখার জন্য অপেক্ষা করা, অতিরিক্ত দুর্বলতাকে সংক্রমণের স্বাভাবিক অংশ মনে করা কিংবা চিকিৎসা চলার পরও রোগীর অবস্থার অবনতি হলেও প্রথম রোগনির্ণয়ের ওপর নির্ভর করে থাকা—এসব কারণে চিকিৎসা পেতে দেরি হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাড়িতে বসে নির্ভরযোগ্যভাবে সেপসিস শনাক্ত করা সম্ভব নয়। কোনো সংক্রমণে আক্রান্ত ব্যক্তির হঠাৎ বিভ্রান্তি, শ্বাসকষ্ট, প্রস্রাবের পরিমাণ ব্যাপকভাবে কমে যাওয়া, খুব কম রক্তচাপ, চরম দুর্বলতা বা দ্রুত অবনতিশীল উপসর্গ দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।
সংক্রমণের অবস্থা হঠাৎ খারাপের দিকে গেলে সেটিকে অবহেলা না করে রোগী সত্যিই সুস্থ হচ্ছেন কি না, চিকিৎসায় কাজ হচ্ছে কি না এবং সংক্রমণ আরও গুরুতর অবস্থায় পৌঁছেছে কি না—এসব বিষয় দ্রুত চিকিৎসকের মাধ্যমে মূল্যায়ন করানো জরুরি। সময়মতো শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা প্রাণঘাতী সেপসিসে রোগীর জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।