ভোগ-বিলাসিতা ও জাগতিক মোহ আত্মিক পরিশুদ্ধি লাভের পথে অন্তরায়। যুগে যুগে সাধক পুরুষরা খাদ্য-পানীয় ও ভোগ-বিলাসিতা ত্যাগের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি লাভের সাধনা করেছেন। শরিয়তে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পার্থিব প্রয়োজন ও জৈবিক চাহিদা উপেক্ষা করার নাম রোজা। বিভিন্ন ধর্মে তাকে উপবাস বলা হয়।নিয়ম-নীতি ভিন্ন হলেও পৃথিবীর প্রায় সব প্রধান ধর্মে রোজার ধারণা পাওয়া যায়। পবিত্র কোরআনের আয়াত থেকে জানা যায়, পূর্ববর্তী আসমানি ধর্মগুলোতে রোজার বিধান ছিল। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমাদের ওপর রোজাকে ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যেন তোমরা আল্লাহভীরু হতে পারো।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৮৩)
বিভিন্ন ধর্মে রোজা ও উপবাসপৃথিবীর প্রধান কয়েকটি ধর্মের উপবাস বা রোজার ধারণা ও নিয়মাবলি তুলে ধরা হলো—
১. ইসলাম ধর্মে রোজা : রোজা ইসলামের ফরজ বিধান এবং পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম।সুস্থ, সাবালক ও মুসাফির নয়, এমন ব্যক্তিদের জন্য প্রতিবছর রমজান মাসে রোজা রাখা ফরজ। মুসলমানরা সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সব ধরনের পানাহার, স্ত্রী সম্ভোগ ও পাপাচার থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে রোজা সম্পন্ন করে। রমজান মাসের রোজা ছাড়াও ইসলাম ধর্মে আরো বিভিন্ন প্রকার রোজা আছে। যেমন—আশুরার রোজা, প্রত্যেক চান্দ্র মাসের মধ্যবর্তী তিন দিনের রোজা, কাজা রোজা, কাফফারার রোজা ইত্যাদি।জেনে-বুঝে ফরজ রোজা অস্বীকার করলে ব্যক্তির ঈমান চলে যাবে।
২. ইহুদি ধর্মে উপবাস : প্রাচীন ধর্মগুলোর মধ্যে ইহুদি ধর্মে রোজা বা উপবাসের পরিমাণ সবচেয়ে কম। ইহুদি ধর্মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপবাস পালন করা হয় ইয়োম কিপ্পুরের সময়। এটা তাদের সবচেয়ে কঠোর উপবাসও বটে। ইহুদি নববর্ষ রোশ হাশানার প্রথম দিন থেকে দশম দিন পর্যন্ত ইহুদিরা অনুতাপ ও অনুশোচনার ভেতর দিয়ে সময় কাটায় এবং দশম দিন তারা রোজা রাখে।ইহুদি ধর্ম বিশ্বাস অনুসারে ইয়োম কিপ্পুরের দিনে তাদের বিগত দিনের পাপ মার্জনা করা হয় এবং আগামী বছরের ভাগ্য লিপিবদ্ধ করা হয়। এই দিনে সূর্যাস্তের আগ থেকে পরের দিন রাত পর্যন্ত মোট ২৫ ঘণ্টা উপবাস পালন করা হয়। ইয়োম কিপ্পুরের উপবাসের সময় তারা সব ধরনের পানাহার, কাজ, যৌন সম্পর্ক ত্যাগ করে। পাশাপাশি পুরো সময়টা প্রার্থনায় রত থাকে।ইহুদিরা তিশা বাআভের রোজাও রাখে। তারা বিশ্বাস করে এই দিনে তাদের দ্বিতীয় মন্দির ধ্বংস করা হয়েছিল। শোকের দিন হিসেবে তারা উপবাস পালন করে। ইয়োম কিপ্পুরের রোজার মতো তারা এই দিনেও ২৫ ঘণ্টা উপবাস পালন করে। এ ছাড়া তাদের আরো কিছু উপবাসের দিন রয়েছে যেগুলোতে তারা সূর্যাস্ত থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত উপবাস পালন করে।
৩. খ্রিস্ট ধর্মে উপবাস : খ্রিস্ট ধর্মের বিভিন্ন ধারায় ভিন্ন ভিন্ন উপবাসের ধারণা পাওয়া যায়। খ্রিস্ট ধর্মের উপবাস ইসলাম বা ইহুদি ধর্মের মতো কঠিন নয়। তাদের উপবাস হলো আংশিক। তারা নির্ধারিত দিনগুলোতে মাংস, মাছ ও চর্বিযুক্ত খাবার পরিহার করে। ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের সবচেয়ে দীর্ঘ রোজাকে বলা হয় লেন্টের উপবাস। লেন্টের উপবাসের সময়কাল ৪০ দিন। এই সময়কালে তারা মাংস খায় না এবং দিনে একবার পেট পূর্ণ করে খাওয়ার অনুমতি পায়। বাকি দুই বেলা হালকা খাবার গ্রহণ করে। এ ছাড়া খ্রিস্টানরা যিশুখ্রিস্টের শূলিবিদ্ধ হওয়ার দিন গুড ফ্রাইডেতেও উপবাস পালন করে।৪. হিন্দু ধর্মে উপবাস : সনাতন ধর্মে উপবাসকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। সনাতন ধর্ম মতে, উপবাস হলো আত্মিক পরিশুদ্ধি লাভের জন্য শারীরিক চাহিদাকে উপেক্ষা করা। উপবাস দেহ ও আত্মার মধ্যে সুরেলা সম্পর্ক সৃষ্টি করে, যা পরমাত্মার সঙ্গে একীভূত হতে সাহায্য করে। হিন্দু সনাতনীরা প্রত্যেক চান্দ্র মাসের একাদশী তিথিতে উপবাস পালন করে থাকে। প্রত্যেক চান্দ্র মাসে শুক্লপক্ষ ও কৃষ্ণপক্ষে দুইবার একাদশী তিথি আসে। এই হিসাবে তারা বছরে ২৪ দিন একাদশী তিথির উপবাস পালন করে।হিন্দুরা মহাশিবরাত্রি উপবাস ও নবরাত্রি উপবাস নামে আরো দুটি উপবাস পালন করে থাকে। এ ছাড়া প্রত্যেক সপ্তাহে চার দিন চার প্রধান দেবতার নামে উপবাসের রীতি আছে। হিন্দু ধর্ম মতে, উপবাস তিন ধরনের : ক. নির্জলা উপবাস, যাতে খাবার-পানীয় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, খ. ফলাহার উপবাস, যাতে ফল খাওয়ার অবকাশ থাকে, গ. একভুক্ত উপবাস, যাতে দিনে একবার খাওয়া হয়, ঘ. আংশিক উপবাস, যাতে নির্ধারিত প্রকারের খাবার বর্জন করা হয়।
৫. বৌদ্ধ ধর্মে উপবাস : বৌদ্ধ ধর্মে ইসলাম, ইহুদি বা হিন্দু ধর্মের মতো বিধিবদ্ধ উপবাসের নিয়ম নেই। তবে সাধারণ অনুসারীরা উপস্থার দিনগুলোতে আংশিক উপবাস পালন করে। উপস্থা হলো চান্দ্র মাসের নির্ধারিত কয়েকটি তিথি। এই সময়ে বৌদ্ধরা দুপুরের পর থেকে পরবর্তী সকাল পর্যন্ত ভারী ও বিলাসী খাবার পরিহার করে এবং ধর্মীয় আলোচনা ও প্রার্থনায় সময় কাটায়। বৌদ্ধ ধর্মযাজকরা সারা বছরই দুপুরের পর ভারী ও বিলাসী খাবার পরিহার করে।
৬. শিখ ধর্মে উপবাস : শিখ ধর্মে উপবাস কোনো বাধ্যতামূলক বিধান নয়, বরং এই ধর্মে উপবাসকে নিরুৎসাহ করা হয়। শিখ ধর্মে উপবাসের পরিবর্তে খাবার গ্রহণে সংযম ও পরিমিত খাবার গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবু শিখ ধর্মে উপবাসের কিছু ধারণা পাওয়া যায়। যেমন—গুরুপূর্বের দিনে, শিখ ধর্মগুরুদের জন্মদিনে এবং পরিবারের সদস্য মারা যাওয়ার পর শোকের দিনগুলোতে। শিখ ধর্মে উপবাসের ধারণাকে আংশিক উপবাসই বলা যায়। যেখানে নির্ধারিত ধরনের খাবার পরিহার করা হয়।ওপরের বর্ণনা থেকে প্রমাণিত হয়, পৃথিবীর প্রায় সব প্রধান ধর্ম আধ্যাত্মিক উন্নতি লাভের মাধ্যম হিসেবে উপবাসকে স্বীকৃতি দিয়ে থাকে।তথ্যঋণ : ইসলাম অনলাইন ডটনেট মিডিয়াম ডটকম ও আল ইসলাম ডটঅর্গ
এ ক্যাটাগরির আরো নিউজ..