ভাতকে ঘিরেই সবচেয়ে বেশি সতর্কতা শোনা যায়। অনেকেই মনে করেন, ভাত দ্বিতীয়বার গরম করলেই বিষক্রিয়া হতে পারে। কিন্তু আসল সমস্যা গরম করায় নয়, বরং রান্নার পর কীভাবে ভাত রাখা হচ্ছে সেখানে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্য খাবার দুই দিন পর্যন্ত রাখা গেলেও ভাত ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই খেয়ে ফেলা ভালো।
টেকঅ্যাওয়ে বা রেস্টুরেন্টের ভাতের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক থাকতে হবে। কারণ অনেক রেস্টুরেন্ট আগেই ভাত রান্না করে পরে আবার গরম করে পরিবেশন করে। ফলে সেটি ইতোমধ্যে একবার পুনরায় গরম করা হয়ে থাকতে পারে।
আলু গরম করলেও ঝুঁকি
ভাতের মতো আলোচনায় না এলেও আলু থেকেও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, বিশেষ করে ফয়েলে মোড়ানো বেকড আলুর ক্ষেত্রে।
খাদ্যস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ র্যাচেল কিস বলেন, ফয়েলে মোড়ানো আলুর ভেতরে উষ্ণ, আর্দ্র ও অক্সিজেনবিহীন পরিবেশ তৈরি হয়, যা ক্লস্ট্রিডিয়াম বটুলিনাম ব্যাকটেরিয়ার জন্য উপযুক্ত।
এই ব্যাকটেরিয়া থেকে তৈরি হতে পারে বটুলিনাম টক্সিন, যা অত্যন্ত শক্তিশালী খাদ্যবিষ। বিপজ্জনক বিষয় হলো—এই বিষের কোনো গন্ধ, স্বাদ বা দৃশ্যমান লক্ষণ থাকে না।
তবে সমাধানও সহজ। আলু রান্নার পর সঙ্গে সঙ্গে ফয়েল খুলে ফেলতে হবে এবং দুই ঘণ্টার মধ্যে ফ্রিজে রাখতে হবে। পরে খাওয়ার সময় ভালোভাবে গরম করতে হবে।
সঠিক নিয়মে গরম না করলেই বিপদ মুরগির মাংসে
মুরগির মাংস পুনরায় গরম করা নিয়ে অনেকের ভয় রয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিকভাবে গরম করলে এতে সমস্যা নেই।
গোয়ার জেমস বলেন, “মুরগিসহ সব ধরনের মাংস নিরাপদভাবে পুনরায় গরম করা যায়, যদি পুরোটা সমানভাবে গরম হয়।”
সমস্যা হয় তখনই, যখন খাবারের কোনো অংশ গরম থাকে আবার কোনো অংশ ঠান্ডা থেকে যায়। এতে ব্যাকটেরিয়া টিকে যেতে পারে।
তাই মুরগির কারি বা স্টির-ফ্রাই গরম করার সময় মাঝেমধ্যে নেড়ে দিতে হবে। বড় টুকরা হলে কেটে নেওয়া ভালো, যাতে তাপ ভেতর পর্যন্ত পৌঁছায়।
ডিমও নিরাপদ নয়
ডিম গরম করে খাওয়া নিয়েও দীর্ঘদিন নানা ভয় ছিল। কিন্তু বর্তমানে খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতির কারণে ডিম আগের চেয়ে অনেক নিরাপদ বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
ফ্রিটাটা, এগ ফ্রাইড রাইস বা ডিমযুক্ত অন্য খাবার পুনরায় গরম করা যায়, যদি দ্রুত ঠান্ডা করে সংরক্ষণ করা হয় এবং পরে পুরোপুরি গরম করা হয়।
ডিমভিত্তিক খাবারও পরিবেশনের আগে ধোঁয়া ওঠা পর্যন্ত গরম করতে হবে।
শুধু গন্ধ শুঁকে বোঝা যায় না
অনেকেই খাবার নষ্ট হয়েছে কি না বুঝতে ‘গন্ধ পরীক্ষা’ করেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি নয়।
নারিমান লুচ বলেন, খাদ্যে বিষক্রিয়ার ব্যাকটেরিয়া বা স্পোর সবসময় দেখা বা গন্ধে বোঝা যায় না। খাবার দেখতে স্বাভাবিক মনে হলেও সেটি অসুস্থ করে তুলতে পারে।
তবে ছত্রাক বা ফাঙ্গাস দেখা গেলে সেটি অবশ্যই ফেলে দিতে হবে। কারণ দৃশ্যমান অংশ ছাড়াও পুরো খাবারে ছড়িয়ে থাকতে পারে।
বয়স্কদের জন্য ঝুঁকি বেশি
৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে খাদ্যে বিষক্রিয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায়, ফলে সালমোনেলা বা ক্যাম্পিলোব্যাকটারের মতো সংক্রমণ সহজে আঘাত হানতে পারে।
তাই বয়স্কদের খাবার সংরক্ষণ ও পুনরায় গরম করার বিষয়ে আরও সতর্ক থাকতে হবে।
যে নিয়মে গরম করা নিরাপদ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোন খাবার গরম করা যাবে আর কোনটি যাবে না—এই তালিকা মুখস্থ করার চেয়ে কয়েকটি সাধারণ নিয়ম মেনে চলাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
রান্না করা খাবার এক থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যে ফ্রিজে রাখতে হবে। যত বেশি সময় বাইরে থাকবে, ব্যাকটেরিয়া তত দ্রুত বাড়বে।
ফ্রিজের তাপমাত্রা ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার কম রাখুন। বায়ুরোধী পাত্র ব্যবহার করুন।
বেশিরভাগ খাবার দুই দিনের মধ্যে খাওয়া ভালো। ভাত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শেষ করতে হবে।
খাবার এমনভাবে গরম করতে হবে যেন পুরোটা ধোঁয়া ওঠা গরম হয়। খাদ্য থার্মোমিটার থাকলে অন্তত ৭৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষ করে মাইক্রোওয়েভে গরম করার সময় এটি জরুরি। কারণ মাইক্রোওয়েভে কোথাও বেশি, কোথাও কম গরম হতে পারে।
বারবার ঠান্ডা ও গরম করলে ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ে। তাই একবার গরম করার পর সঙ্গে সঙ্গে খেয়ে ফেলতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগের দিনের খাবার খাওয়া নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। অধিকাংশ খাবারই নিরাপদভাবে পুনরায় গরম করে খাওয়া সম্ভব—যদি সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয় এবং ভালোভাবে গরম করা হয়।
অর্থাৎ, “কখনোই গরম করা যাবে না” ধরনের কঠোর নিয়মের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো খাদ্যস্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। একটু সচেতনতা থাকলেই ফ্রিজে রাখা খাবার হতে পারে নিরাপদ, সাশ্রয়ী এবং সময় বাঁচানো সমাধান।