অন্যদিকে হাদিসেও একাধিকবার নামাজ আদায় করার কথা এসেছে। সেই সঙ্গে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে ওয়াক্তমতো নামাজ আদায়ের ওপর। এমনকি খোদ মহান আল্লাহ তা’আলার কাছেও যথাসময়ে সালাত আদায় করা অধিক প্রিয় একটি আমল।
আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রা.) বলেন, একবার আমি রাসুল (সা.) কে জিজ্ঞাসা করলাম, কোন আমল আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়? জবাবে তিনি (নবীজি সা.) বললেন, যথাসময়ে সালাত আদায় করা।
কেউ নামাজরত থাকেলে তার জন্য ফেরেশতারাও মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে দোয়া করতে থাকেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কেউ যতক্ষণ পর্যন্ত সালাতরত থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত ফেরেশতারা এ বলে দোয়া করতে থাকে- হে আল্লাহ! আপনি তাকে ক্ষমা করে দিন, হে আল্লাহ! তার প্রতি রহম করুন (এ দোয়া চলতে থাকবে) যতক্ষণ পর্যন্ত লোকটি সালাত (নামাজ) ছেড়ে না দাঁড়াবে অথবা তার অজু ভঙ্গ না হবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩০০২)
তবে বিশেষ কোনো কারণে যদি কোনো ওয়াক্তের নামাজ ছুটে যায় তবে পরবর্তীতে সেই নামাজের কাজা আদায় করতে হয়।
কিন্তু কারও যদি একাধিক ওয়াক্তের নামাজ কাজা থাকে তাহলে সে ক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে কাজা আদায় করতে হবে। অর্থাৎ, কারও যদি জোহর, আসর ও মাগরিবের ওয়াক্তের নামাজ কাজা হয়, তাহলে এশার সময় কাজা আদায় করলে আগে জোহরের কাজা আদায় করতে হবে। এরপর ক্রমান্বয়ে আসর ও মাগরিবের কাজা আদায় করতে হবে।
খোদ রাসুল (সা.) ও যুদ্ধের সময় এমনটি করেছিলেন। আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, মুশরিকরা খন্দকের যুদ্ধের সময় রাসুল (সা.) কে ৪ ওয়াক্তের সালাত আদায়ে বিঘ্নের সৃষ্টি করে। এমনকি রাতের কিছু অংশও অতিবাহিত হয়ে যায়, কিন্তু তিনি সালাত আদায় করতে পারলেন না। পরে নবীজি (সা.) বিলাল (রা.) কে আজান (এশা) দিতে বললেন। এরপর বিলাল (রা.) আজান দিয়ে ইকামত দিলেন। পরে রাসুল (সা.) জোহরের সালাত আদায় করলেন। এরপর আবারও তিনি (বিলাল রা.) ইকামত দিলেন, রাসুল (সা.) আসরের সালাত আদায় করলেন। তারপর আবার ইকামত দেয়া হয় এবং রাসুল (সা.) মাগরিবের সালাত আদায় করলেন। একইভাবে পুনরায় ইকামত দেয়া হয় এবং রাসুল (সা.) এশার সালাত আদায় করলেন। (সুনান আত তিরমিজি, হাদিস: ১৭৯-১৮০; সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৬৯)
জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদিসে এসেছে, খন্দকের যুদ্ধ চলাকালে একসময় ওমর (রা.) কুরাইশ কাফিরদের ভর্ৎসনা করতে লাগলেন এবং বললেন, সূর্যাস্তের পূর্বে আমি আসরের সালাত আদায় করতে পরিনি। জাবির (রা.) আরও বর্ণনা করেন, ওই ঘটনার পর আমরা বুতহান উপত্যকায় উপস্থিত হলাম। সেখানে তিনি সূর্যাস্তের পর সে সালাত আদায় করলেন, তারপর মাগরিবের সালাত আদায় করলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৭১)
তবে কেউ যদি অবহেলায় কিংবা শয়তানের ধোঁকায় পড়ে অসংখ্য দিন নামাজ না পড়েন, অথবা নামাজ ছেড়ে দিয়েছিলেন, তাহলে করণীয় কী? এ ক্ষেত্রে প্রায়সময়ই অনেকে জীবনে অসংখ্য নামাজ কাজা করার বিষয়টিকে ‘উমরি কাজা’ বলে অবহিত করে থাকেন। কিন্তু আসলেই যদি কারও জীবনে এক বা দুই বছর কিংবা এর চেয়েও বেশি সময়ের নামাজ কাজা হয়, তবে শরিয়তের বিধান অনুযায়ী তিনি কীভাবে সে নামাজগুলো আদায় করবেন তা নিয়ে অনেকেই দ্বিধায় ভুগেন।
এ ক্ষেত্রে ইসলামিক স্কলার শায়খ আহমাদুল্লাহর মতে কারও অসংখ্য নামাজ কাজা হওয়ার বিষয়ে ওলামায়ে-কেরামদের মধ্যে দু’টি মত রয়েছে। এরমধ্যে সাম্প্রতিক সময়ের ওলামায়ে আরবদের একটি মত হলো- ‘উমরি কাজা’ বলতে কোনোকিছু নেই। ইসলামেও এমন কোনো শব্দ নেই। আর আরেকটি মত হলো- একজন মুসলিম আগে অবহেলা করে ছাড়ার পর আর নামাজ পড়তেন না, কিন্তু এখন আল্লাহ তা’আলা তাকে সঠিক বুঝ দিয়েছেন, হেদায়েত পেয়েছেন, তাই যতদিন বালেগ (প্রাপ্তবয়স্ক) হওয়ার পর তিনি নামাজ পড়েননি, সেই নামাজগুলো তার কাজা আদায় করা উচিত। বেশিরভাগ প্রখ্যাত আলেম এই মতটির পক্ষে।
সুতরাং, কারও এক বা দুই বছর কিংবা এর চেয়ে বেশি সময়ের নামাজ কাজা থাকলে, আনুমানিক হিসেব করে ধারাবাহিকভাবে তিনি ওই পরিমাণ নামাজের কাজা আদায় করবেন। এ ক্ষেত্রে প্রতিদিন দুই-চার রাকাত করে কাজা আদায় করতে পারেন। সেই সঙ্গে নফল নামাজের পরিমাণ বাড়ানো উচিত বলেও মনে করেন ইসলামিক স্কলার শায়খ আহমাদুল্লাহ।