জাহেলি যুগে শুক্রবারের নাম
ইসলামের আগমনের পূর্বে আরবরা শুক্রবারকে ‘ইয়াওমুল আরুবা’ নামে চিনত। ইতিহাসবিদদের বর্ণনা অনুযায়ী, মহানবী (সা.)-এর অন্যতম পূর্বপুরুষ কাব ইবনে লুয়াই সর্বপ্রথম এ দিনের নাম পরিবর্তন করে ‘ইয়াওমুল জুমুআহ’ রাখেন। তিনি প্রতি শুক্রবার কুরাইশদের সমবেত করতেন এবং তাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতেন। এ ঘটনা ঘটেছিল মহানবী (সা.)-এর আবির্ভাবের প্রায় পাঁচ শত ষাট বছর পূর্বে। সেই সময় থেকেই দিনটি সমাবেশ ও সম্মিলনের দিনের পরিচয় লাভ করে।
জুমার গুরুত্ব
ইসলামে জুমার মর্যাদা এতই মহান যে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরার নামই রেখেছেন ‘সুরা জুমুআহ’। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং বেচাকেনা বন্ধ করে দাও। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।’(সুরা : জুমুআহ, আয়াত : ৯)
এই আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, জুমা শুধু একটি নামাজ নয়; বরং এটি আল্লাহর বিশেষ নির্দেশে প্রতিষ্ঠিত একটি মহান ইবাদত।
ইসলামের ইতিহাসে প্রথম আনুষ্ঠানিক জুমা
হিজরতের পর মহানবী (সা.) প্রথমে কুবা এলাকায় কয়েক দিন অবস্থান করেন। এরপর তিনি মদিনার উদ্দেশে রওনা হন। পথিমধ্যে বনি সালেম ইবনে আউফ গোত্রের উপত্যকায় পৌঁছলে জোহরের সময় হয়ে যায়। সেদিন ছিল শুক্রবার। মহানবী (সা.) সেখানে উপস্থিত সাহাবায়ে কেরামকে সঙ্গে নিয়ে জুমার খুতবা প্রদান করেন এবং জুমার নামাজ আদায় করেন। ইতিহাসে এটিই মহানবী (সা.)-এর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত প্রথম আনুষ্ঠানিক জুমা হিসেবে স্বীকৃত। আর এই ঘটনাই ইসলামী ইতিহাসে জুমার নামাজের বাস্তব ও প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা হিসেবে গণ্য হয়। এরপর থেকে মুসলমানদের জন্য জুমার নামাজ একটি ফরজ ইবাদত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে মুসলিম সমাজের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় সমাবেশে পরিণত হয়। (দরসে তিরমিজি : ২/১৯২, মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, হাদিস : ৫১৪৪)
মদিনায় জুমার প্রাথমিক চর্চা
মহানবী (সা.) মদিনায় হিজরত করার পূর্বেই সেখানে বসবাসকারী আনসার সাহাবিরা সপ্তাহে একটি নির্দিষ্ট দিনে একত্রিত হয়ে আল্লাহর ইবাদত করার প্রয়োজনিয়তা অনুভব করেন। মুহাম্মদ ইবনে সিরিন (রহ.) বর্ণনা করেন, আনসারগণ আলোচনা করলেন—ইহুদিদের জন্য শনিবার এবং খ্রিস্টানদের জন্য রবিবার নির্ধারিত রয়েছে, যেদিন তারা সমবেত হয়। অতএব মুসলমানদেরও একটি নির্দিষ্ট দিন থাকা উচিত, যেদিন সবাই একত্র হয়ে আল্লাহর ইবাদত করবে।
এভাবে জুমার নামাজ ইসলামের অন্যতম মহান নিদর্শন এবং মুসলিম উম্মাহর সাপ্তাহিক সমাবেশ হয়ে উঠে। এর শিকড় প্রোথিত রয়েছে ইসলামের প্রারম্ভিক ইতিহাসে। আনসার সাহাবিদের আগ্রহ, তাদের ঐক্যবদ্ধ চিন্তা এবং সর্বোপরি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নেতৃত্বে বনি সালেম গোত্রের উপত্যকায় অনুষ্ঠিত প্রথম আনুষ্ঠানিক জুমার মাধ্যমে এ মহান ইবাদতের যাত্রা শুরু হয়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত পৃথিবীর প্রতিটি অঞ্চলে কোটি কোটি মুসলমান প্রতি শুক্রবার আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে মসজিদে সমবেত হচ্ছেন।
জুমা আমাদের শেখায়—ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব, আল্লাহর স্মরণ এবং ইসলামের প্রতি অবিচল আনুগত্য। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত জুমার মর্যাদা উপলব্ধি করা, এর আদব ও সুন্নতসমূহ যথাযথভাবে পালন করা এবং এই বরকতময় দিনকে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের একটি সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে জুমার মর্যাদা উপলব্ধি করে যথাযথভাবে তা আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।