‘লাং এজ’ বলতে বোঝায় আপনার ফুসফুস কতটা ভালোভাবে কাজ করছে, সেটি আপনার একই বয়স, লিঙ্গ ও শারীরিক গঠনের একজন সুস্থ মানুষের ফুসফুসের সঙ্গে তুলনা করে বোঝার একটি ধারণা।ডা. সৌপর্ণ সাহার ভাষায়, এটি হলো আপনার ফুসফুসের কার্যক্ষমতা আপনার বয়স, লিঙ্গ ও উচ্চতার সঙ্গে প্রত্যাশিত কার্যক্ষমতার তুলনায় কেমন তার একটি পরিমাপ।
ফুসফুসের অকাল বার্ধক্যের সবচেয়ে পরিচিত কারণগুলোর একটি হলো ধূমপান। তামাকের ধোঁয়া ফুসফুসে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ ও কোষের ক্ষতি তৈরি করতে পারে। দীর্ঘদিন ধোঁয়ার সংস্পর্শে থাকলে শ্বাসনালির আবরণ এবং ফুসফুসের ক্ষুদ্র বায়ুথলিগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অথচ শরীরে অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এসব বায়ুথলির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
২. পরোক্ষ ধূমপান
আপনি নিজে ধূমপান না করলেও আশপাশের মানুষের ধোঁয়া আপনার ফুসফুসের ক্ষতি করতে পারে। পরোক্ষ ধূমপানের কারণে ধীরে ধীরে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমতে পারে। সমস্যা হলো, এই ক্ষতি দীর্ঘ সময় কোনো স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই চলতে পারে। ফলে শুরুতেই বিষয়টি বুঝে ওঠা কঠিন হয়।
৩. বাইরের বায়ুদূষণ
যানবাহন, শিল্পকারখানা ও জ্বালানি পোড়ানোর ফলে তৈরি সূক্ষ্ম কণা ও বিভিন্ন ক্ষতিকর গ্যাস শ্বাসনালিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ তৈরি করতে পারে। দীর্ঘদিন দূষিত বাতাসে থাকার ফলে ফুসফুসের কার্যক্ষমতায় স্থায়ী ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
৪. ঘরের ভেতরের দূষণ
শুধু বাইরের বাতাসই নয়, ঘরের বাতাসও ফুসফুসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অপর্যাপ্ত বায়ু চলাচলযুক্ত রান্নাঘরের ধোঁয়া, কঠিন জ্বালানি এবং তামাকের ধোঁয়া ঘরের ভেতরে জমে যেতে পারে। বাইরের বায়ুদূষণের সঙ্গে এসব দূষণের প্রভাব যোগ হয়ে ফুসফুসের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
৫. কর্মক্ষেত্রের ধুলা-রাসায়নিক
নির্মাণকাজ, খনি, স্বাস্থ্যসেবা, টেক্সটাইল ও কারখানায় কাজ করা ব্যক্তিদের নিয়মিত ধুলা, রাসায়নিক বা ধোঁয়ার সংস্পর্শে আসতে হয়। যথাযথ সুরক্ষা সরঞ্জাম ও বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা না থাকলে দীর্ঘদিন এসব উপাদানের সংস্পর্শে থাকা ফুসফুসে দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা তৈরি করতে পারে।
৬. বারবার শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ
বারবার বা গুরুতর শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণও ফুসফুসের ক্ষতির কারণ হতে পারে। বিশেষ করে শৈশবে এমন সংক্রমণ হলে ফুসফুসের টিস্যুতে ক্ষত তৈরি হতে পারে এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
৭. বংশগত কারণ
সব মানুষের ফুসফুস ক্ষতির ঝুঁকি এক রকম নয়। কারও কারও জেনেটিক বা বংশগত কারণেই ফুসফুস ক্ষতির প্রতি বেশি সংবেদনশীল হতে পারেন।
ফুসফুসের ক্ষতি শুরু হলে কী বোঝা যায়
ফুসফুসের ক্ষতি সবসময় শুরুতেই স্পষ্ট হয় না। অনেক সময় শ্বাসতন্ত্রের ছোট ছোট অংশে পরিবর্তন শুরু হয়ে যায়, কিন্তু তখন বড় কোনো উপসর্গ দেখা নাও দিতে পারে। বিশেষজ্ঞের মতে, ফুসফুসের ক্ষতির প্রাথমিক পর্যায়ে ছোট শ্বাসনালি আক্রান্ত হতে পারে। এটি পরবর্তী সময়ে ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ বা সিওপিডি-এর মতো দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমলে শরীরে যা ঘটে
ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমতে শুরু করলে তার প্রভাব দৈনন্দিন জীবনেও ধীরে ধীরে দেখা দিতে পারে। যেখানে আগে সহজে সিঁড়ি দিয়ে উঠতেন, এখন লিফট খুঁজছেন। আগে যে দূরত্ব হেঁটে যেতেন, এখন হাঁটলেই হাঁপিয়ে যাচ্ছেন। পছন্দের শারীরিক কাজগুলোও ধীরে ধীরে এড়িয়ে চলছেন, কারণ শরীর দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ছে বা শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
ডা. সৌপর্ণ সাহার মতে, ফুসফুসের অবনতির প্রথম দিকের লক্ষণগুলো অনেক সময় চোখে পড়ে না বা মানুষ সেগুলোকে গুরুত্ব দেন না। ধীরে ধীরে শারীরিক কর্মকাণ্ড কমিয়ে দেয়া, সিঁড়ির বদলে লিফট ব্যবহার করা, আগের পছন্দের কাজ এড়িয়ে চলা কিংবা অল্পতেই ক্লান্ত ও শ্বাসকষ্ট অনুভব করা এসবকে শুধু বয়সের স্বাভাবিক পরিবর্তন ধরে নেয়া উচিত নয়।
কারণ, এসব উপসর্গের পেছনে অন্য কোনো কারণও থাকতে পারে। তাই নিয়মিত কাজকর্মে আগের তুলনায় বেশি ক্লান্তি বা শ্বাসকষ্ট হলে বিষয়টি চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলাই ভালো।