দেশের সব গণমাধ্যম বিশ্বকাপময় আজ। শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা বিশ্বই এখন ফুটবল জ্বরে আক্রান্ত।
দেশের সব গণমাধ্যম বিশ্বকাপময় আজ। শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা বিশ্বই এখন ফুটবল জ্বরে আক্রান্ত।
সেই যুক্তরাষ্ট্রে থাকা এক বাঙালি আক্ষেপ করে ফেসবুকে লিখেছেন, নিউইয়র্কে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও তিনি মেসির নাম লেখা কোনো জার্সি পাননি। আর বাংলাদেশে বিশ্বকাপ শুরুর এক মাস আগে থেকেই জার্সির জমজমাট ব্যবসা হচ্ছে। বাংলাদেশে শুধু জার্সির মার্কেটই কয়েক কোটি টাকার। যুক্তরাষ্ট্রের রাস্তায় হাঁটলে নাকি বোঝা যায় না, এখানে বিশ্বকাপ হচ্ছে। আর মাসখানেক আগে থেকেই বাংলাদেশ বিশ্বকাপের ছোঁয়ায় রঙিন। বাড়িতে বাড়িতে উড়ছে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকা। প্রিয় দলের রঙে গোটা বাড়ি রাঙিয়ে নিয়েছেন অনেকে। অনেক এলাকার চেহারাই বদলে গেছে।
আগামী দেড় মাস বাংলাদেশের রুটিনই বদলে যাবে। রাতভর খেলা দেখে ঘুম ঘুম চোখে অফিসে যাবে লোকজন। অফিসেও কাজের চেয়ে আগের রাতের খেলার বিশ্লেষণ হবে বেশি। বিশ্বকাপ এলেই টিভি বিক্রির ধুম পড়ে যায়। পাড়ায় পাড়ায় বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন হয়। ঘরে ঘরে রাতভর খেলা দেখার জন্য বিশেষ খাবার, বন্ধু-বান্ধব মিলে একসাথে খেলা দেখা—অন্যরকম এক উৎসবের আবহ দেশজুড়ে।
বাংলাদেশ বিভক্ত হয়ে যাবে ব্রাজিল-আজেন্টিনায়। পাশের টেবিলের সহকর্মী, ভাই-বোন, প্রেমিক-প্রেমিকা, স্বামী-স্ত্রী, এমনকি বাবা-ছেলেও এই দেড়মাস ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা, মানে শত্রুপক্ষ। কথা কাটাকাটি, ঝগড়াঝাাটি, মান-অভিমান, এমনকি মারামারি পর্যন্ত হবে। দেড়মাস পর গালাগালি আবার গলাগলিতে বদলে যাবে। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ যা করে, তা দেখে লজ্জা পাবেন বা অনুপ্রাণিত হতে পারেন খোদ ব্রাজিলিয়ান বা আর্জেন্টাইনরাও।
এক সময় বাংলাদেশে ব্রাজিলের সমর্থক বেশি ছিল। ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার একক নৈপূণ্যে বিশ্বকাপ জেতার পর আর্জেন্টিনার সমর্থন হু হু করে বাড়তে থাকে। আর মেসির বিশ্বকাপ জয়ের পর তা চূড়ায় উঠেছে। আর্জেন্টিনার মোট জনসংখ্যা সাড়ে ৪ কোটি। সম্ভবত বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার সমর্থক আর্জেন্টিনার চেয়ে বেশি। আসলেই বাংলাদেশে ফুটবল এক আনন্দময় উন্মাদনার নাম। বিশ্বকাপ আসলে বাংলাদেশের মানুষ এমনকি বাংলাদেশকেও ভুলে যায়।
শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দল এখন বাংলাদেশ সফর করছে। দুদিন আগে সিরিজের প্রথম ম্যাচে ২১ বছর পর অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছে বাংলাদেশ। আজ সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচ। বাংলাদেশ এখন দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের দুয়ারে। আজ জিতলেই বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজ জিতবে। এক সময় যেটা কল্পনা করতেও সাহস লাগত। ম্যাচটি হবে ঢাকার মিরপুরে। কিন্তু কোথাও কোনো আওয়াজ নেই।
বিশ্বকাপের ভিড়ে আজকের পত্রিকায় বাংলাদেশের এই অতি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের খবর খুঁজে পেতে অনুবীক্ষণযন্ত্র লাগবে। এমনকি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বাজেট পেশের খবরও ফুটবলের আড়ালে চলে গেছে। ফুটবলের আড়ালে চলে গেছে আরেকটি খবরও।
যুক্তরাষ্ট্রে যখন বিশ্বকাপের ঢক্কানিনাদ, ইরানে তখন নতুন করে বাজছে যুদ্ধের দামামা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের একতরফা যৌথ আক্রমণে যে যুদ্ধ শুরু, তা থামেনি এখনো। মাঝে যুদ্ধবিরতি হয়েছে, পাকিস্তানের দুতিয়ালিতে যুদ্ধ থামানোর চেষ্টাও হচ্ছে। একবার পাকিস্তানে দুপক্ষ সামনাসামনি বসেছেও। নানান শর্ত বিনিময় হচ্ছে। কিন্তু কারো কারো গোয়ার্তুমি আর শর্তের বেড়াজালে আটকে আছে যুদ্ধবন্ধের সম্ভাবনা। যুক্তরাষ্ট্র একটু নমনীয় হলে ইসরায়েল আবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে লেবাননে হামলা শুরু করলে যুদ্ধে নতুন নতুন উত্তেজনা বাড়ে। ক্ষিপ্ত হয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরায়েলের প্রধানমন্ত্রীকে ‘উন্মাদ’ বলেছেন। আসলে ব্যাপারটা ‘এক বুড়িকে আরেক বুড়ির নানি’ বলার মতো।
ট্রাম্প নিজেই নেতানিয়াহুর চেয়েও বড় উন্মাদ। এই দুই যুদ্ধ উন্মাদ মিলে গোটা বিশ্বকেই গভীর এক খাদের কিনারে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় জ্বালানি তেলের সরবরাহ পাঁচভাগের একভাগ কমে গেছে। তাতে বেড়ে গেছে দাম। আর জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে যে সবকিছুর দাম বাড়ে, এটা অথনীতি একদম না বোঝা মানুষটাও জানে। এ যুদ্ধ বিশ্ব অথনীতিকে এক অবশ্যম্ভাবী মন্দার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। যুদ্ধ যত প্রলম্বিত হবে, মন্দা তত তীব্র হবে। ফুটবলও এক ধরনের যুদ্ধ। ফুটবল মাঠেও আক্রমণ পাল্টা আক্রমণ হয়। কিন্তু ফুটবলের লড়াই আসল যুদ্ধের মতো ধ্বংস ডেকে আনে না।
আগামী দেড় মাস হয়তো সবাই সবকিছু ভুলে থাকবে। প্রিয় দলের গোলের পর সারাবিশ্বে সম্মিলিত চিৎকার হয়তো মিসাইলের শব্দকেও ছাড়িয়ে যাবে। কিন্তু এই সময়ে যুদ্ধ না থামলে ফুটবল শেষে মানুষ দেখবে তাদের খাবার প্লেটে টান পড়েছে। গোল বা ট্রফিতে তো আর পেট ভরবে না। আমরা গণতন্ত্রের কথা বলি, জনমতের কথা বলি। কিন্তু ভিন্নমতকে মানি না। গোটা বিশ্বে যদি এখন গণভোট হয়, প্রায় সবাই যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে রায় দেবেন। এমনকি খোদ আমেরিকাতেও অধিকাংশ মানুষ যুদ্ধের বিপক্ষে। তবে সিদ্ধান্ত নেয়ার চেয়ারে যারা বসে আছেন তাদের কাছে জনমতের গুরুত্ব সামান্যই। মানুষ কী ভাবল তাতে তাদের বয়েই গেছে। ফুটবলের খবর আপাতত যুদ্ধের খবরকে একটু আড়াল করতে পেরেছে। একেবারে যুদ্ধটা আড়াল করে ফেলতে পারত!