অহংকার খতরনাক গুনাহগুলোর মধ্যে সেরা গুনাহ। নিজের সম্পদ, সৌন্দর্য, অবস্থান নিয়ে নিজেকে বড় মনে করা আর অন্যকে ছোট মনে করাই হলো অহংকার। আসলে মানুষকে আল্লাহ যে সম্পদ, সৌন্দর্য, মেধা অবস্থান দিয়েছেন এগুলো সবই আমানত। যার নিয়ামত যত বেশি তার পরীক্ষাও তত বেশি।
এ অনুভূতি থেকেই আমরা দেখতে পাই ওলি-বুজুর্গরা সব সময় পেরেশান থাকতেন তাদের পরিণতি নিয়ে। কেননা যাকে আল্লাহ কিছু নিয়ামত দিয়েছেন, সে নিয়ামতের হিসাবও তার থেকে খুব কঠিনভাবে নেওয়া হবে। তাই বুজুর্গরা যখনই কোনো সম্পদের মালিক হতেন সঙ্গে সঙ্গে তা আল্লাহর রাস্তায় দান করে দিতেন। তারা যদি কোনো মেধার মালিক হতেন, সঙ্গে সঙ্গে দাওয়াতের কাজে খরচ করে ফেলতেন।
তারা কোনো ইবাদত করলে সেটাকে আল্লাহর করুণা মনে করে নিজেকে তুচ্ছাতিতুচ্ছ ভাবতেন। আসলে ইবাদত করতে পারাটা বান্দার কোনো কৃতিত্ব নয়, পুরোটাই আল্লাহর অনুগ্রহ। তাই যে ইবাদত করতে পেরেছে তার এ নিয়ে অহংকার করার কোনো সুযোগ নেই। বরং সে আরও শুকরিয়া আদায় করবে আল্লাহ তাকে ইবাদত করার তৌফিক দিয়েছেন এ কারণে।এ সম্পর্কে একটি জ্ঞানগর্ভ হাদিস জেনে নিই। হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে আনসারি সাহাবি জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে। একবার রসুল (সা.) সাহাবিদের কাছে এসে বললেন, তোমাদের এক আজব গল্প শোনাব। এই মাত্র জিবরাইল এসে আমাকে গল্পটি বলেছেন। জিবরাইল গল্পটি শুরু করেছেন আল্লাহর নামে কসম খেয়ে।
কসম খাওয়ার তাৎপর্য হলো ঘটনাটির বিশ্বস্ততা নিয়ে যেন কোনো সন্দেহের দানাও না জন্মে। জিবরাইল বললেন, হে আমার বন্ধু! আমি এমন এক ইবাদতগোজার আল্লাহর ওলি সম্পর্কে জানি যিনি একনাগাড়ে ৫০০ বছর ইবাদতে ডুবেছিলেন। দুনিয়া থেকে অনেক দূরে এক পাহাড়ের চূড়ায় ছিল তার খানকাহ। চারদিক ছিল সমুদ্র দিয়ে ঘেরা। সেই নির্জন পাহাড়ের চূড়ায় তার পানের জন্য আল্লাহ একটি মিষ্টি পানির ঝরনা আর একটি আনার গাছের ব্যবস্থা করলেন। প্রতিদিন তিনি একটি করে আনার খেতেন এবং সন্ধ্যায় অজু করে নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। সারা রাত তিনি নামাজে দাঁড়িয়ে কাঁদতেন। এক দিন কাঁদতে কাঁদতে তিনি দোয়া করলেন, হে আল্লাহ! আমি চাই আমি যেন সেজদাহ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করি এবং সেজদাহ অবস্থায় পুনরুত্থিত হই। আমার দেহকে আপনি মাটি বা পানি থেকে হেফাজত করুন, যেন আমার দেহ অক্ষত থাকে। তার দোয়া আল্লাহ কবুল করলেন। এক দিন তিনি সেজদাহরত অবস্থায় মারা গেলেন। তার দেহ মাটি বা পানির জন্য হারাম করা হয়েছে। নবীজি! আপনি শুনলে অবাক হবেন আমরা যখন আসমান থেকে জমিনে নামি কিংবা জমিন থেকে আসমানে যাই তখন ওই আবেদকে সেজদাহরত অবস্থায় দেখতে পাই।ঘটনার এ পর্যন্ত বর্ণনা করার পর জিবরাইল (আ.) কিছুটা বিরতি নিয়ে বললেন, হে আল্লাহর বন্ধু! আল্লাহর অসীম জ্ঞানের মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি, কিয়ামতের দিন যখন সবাই বিচারের মুখোমুখি দাঁড়াবে তখন ওই বান্দাকেও আল্লাহ ডাকবেন। তাকে বলবেন, আমার রহমতে তুমি বেহেশতে যাও। সে বলবে, হে আল্লাহ! আমি আমার ইবাদতের বিনিময়ে বেহেশতে যেতে চাই। এ কথা শুনে আল্লাহ ফেরেশতাদের ডেকে বলবেন, এ বান্দা তার ইবাদতের বিনিময়ে বেহেশতে যেতে চায়। এক কাজ করো, আমি তাকে যত নিয়ামত দিয়েছি সেগুলো এবং তার ইবাদতের একটি তুলনামূলক মূল্য নির্ধারণ করো। ফেরেশতারা হিসাব কষে দেখবেন তার চোখের মূল্য চুকাতেই ৫০০ বছরের ইবাদত শেষ হয়ে গেছে। তখন আল্লাহ বলবেন, তাকে জাহান্নামে ফেল। সঙ্গে সঙ্গে ওই আবেদকে টেনেহিঁচড়ে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। এবার সে নিজের ভুল বুঝতে পেরে বলবে, হে আল্লাহ! আমার আমলের বিনিময়ে নয় বরং আপনার রহমতে আমাকে বেহেশত দান করুন। এ কথা শুনে আল্লাহ বলবেন, তাকে আমার সামনে নিয়ে আসো। সামনে নিয়ে আসা হলে আল্লাহ তাকে বলবেন, হে বান্দা! তোমার কোনো অস্তিত্বই ছিল না। তোমাকে অস্তিত্ব কে দিয়েছে? তোমাকে ৫০০ বছর ইবাদতের সামর্র্থ্য কে দিয়েছে? চারদিকে সমুদ্রের মাঝে ছিল তোমার বসতি। সেখানে কে তোমাকে মিষ্টি পানির ঝরনা দিয়েছিল? কে তোমার জন্য প্রতিদিন একটি করে আনারের ব্যবস্থা করেছিল? তুমি কি জানো না, আনার বছরে কেবল একটি মৌসুমেই ফলে। অথচ তুমি প্রতিদিন আনার পেতে। তোমার দোয়া কবুল করে কে সেজদাহ অবস্থায় তোমার মৃত্যু দিয়েছিল। প্রতিটি প্রশ্নের জবাবে বান্দা বলবে, আল্লাহ আপনিই এসব করেছেন। এরপর আল্লাহ বলবেন, ইবাদতের বড়াইয়ে নয় বরং আমার রহমতে বেহেশতে প্রবেশ করো। জিবরাইল (আ.) বললেন, সবকিছুই আল্লাহর রহমতে হয়ে থাকে।’ (মুস্তাদরাক হাকেম, চতুর্থ খণ্ড, ২৭৮ পৃষ্ঠা; আবুল ইমান, চতুর্থ খণ্ড, ১৫০ পৃষ্ঠা)।
লেখক : প্রিন্সিপাল, সেইফ এডুকেশন ইনস্টিটিউট, পীর আউলিয়ানগর
এ ক্যাটাগরির আরো নিউজ..