মুমিনের কাছে শরিয়ার প্রথম গুরুত্ব হলো—এর উৎস মানুষের বানানো কোনো মতবাদ নয়; বরং আল্লাহর ওহি।আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হুকুম তো একমাত্র আল্লাহরই।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৪০)
২. রাসুল (সা.)-এর আনুগত্য শরিয়া মানার অপরিহার্য অংশ
কোরআনের পাশাপাশি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহও মুসলিম জীবনের পথনির্দেশ। রাসুল (সা.)-এর নির্দেশ মেনে চলা আল্লাহরই আনুগত্য।
মানুষের প্রবৃত্তি তাকে সবসময় সঠিক পথে পরিচালিত করে না। কখনো অর্থের লোভ, কখনো রাগ, কখনো ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা, কখনো কামনা-বাসনা মানুষকে সীমালঙ্ঘনের দিকে নিয়ে যায়। শরিয়াহ মানুষকে শেখায়—সবকিছু করার ক্ষমতা থাকলেই সবকিছু করা বৈধ নয়। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা কি জাহেলিয়াতের বিধান কামনা করো? দৃঢ় বিশ্বাসীদের জন্য বিধান প্রদানে আল্লাহর চেয়ে উত্তম আর কে?’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৫০)
৪. শরিয়া ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে
শরিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার ও সদাচরণের নির্দেশ দেন।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৯০)
শরিয়াহ মানার অর্থ হলো নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলেও ন্যায়কে গ্রহণ করা। আপনজনের পক্ষ নিয়ে অন্যায় না করা, দুর্বলকে ঠকানো না, মাপে-ওজনে কম না দেওয়া, আমানতের খেয়ানত না করা—এসবও শরিয়াহ পালনের অংশ।
৫. শরিয়া মানুষের অধিকার সংরক্ষণ করে
ইসলাম মানুষের জান, মাল, সম্মান ও অধিকারকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। একজন মুসলিম শুধু আল্লাহর হক আদায় করলেই দায়িত্ব শেষ হয়েছে—এমন নয়; মানুষের হকও তাকে আদায় করতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজের ভাষণে মানুষের রক্ত, সম্পদ ও সম্মানের মর্যাদা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন।
৬. শরিয়া মানা ঈমানের দাবি
প্রকৃত ঈমানের দাবি হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর সিদ্ধান্তকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমার রবের কসম! তারা মুমিন হবে না, যতক্ষণ না নিজেদের পারস্পরিক বিরোধের ক্ষেত্রে তোমাকে বিচারক মেনে নেয়; অতঃপর তোমার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তাদের মনে কোনো সংকীর্ণতা না থাকে এবং তারা পূর্ণভাবে মেনে নেয়।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৬৫)
৭. শরিয়ার বিধান পছন্দ-অপছন্দের ওপর নির্ভরশীল নয়
একজন মুমিনের জন্য আল্লাহর কোনো বিধান নিজের মনমতো না হলেই তা প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ নেই। কারণ সে বিশ্বাস করে—আল্লাহ সর্বজ্ঞ; আর মানুষ সীমিত জ্ঞানের অধিকারী। আল্লাহ বলেন, ‘কোনো মুমিন পুরুষ বা মুমিন নারীর জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসুল কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিলে সে বিষয়ে নিজের অন্য কোনো সিদ্ধান্তের অধিকার থাকবে না।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৩৬)
তবে শরিয়াহর কোনো নির্দিষ্ট বিধান বুঝতে অসুবিধা হলে জ্ঞানী ও বিশ্বস্ত আলেমদের কাছে ব্যাখ্যা জানতে হবে। নিজের অজ্ঞতা দিয়ে শরিয়াহর ব্যাখ্যা করা উচিত নয়।
৮. শরিয়া মানা শুধু মসজিদের ভেতরের বিষয় নয়
অনেক সময় আমরা দ্বীনকে নামাজ, রোজা ও মসজিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলি। অথচ একজন মুসলিমের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইসলামের নৈতিক ও শরয়ি নির্দেশনা রয়েছে। ব্যবসায়— সততা, পরিবারে— দায়িত্ব ও ভালোবাসা, সমাজে— ন্যায় ও আমানতদারি, চোখে— হারাম থেকে সংযম, জবানে— মিথ্যা, গীবত ও অপবাদ থেকে বিরত থাকা, উপার্জনে— হালাল পথ অবলম্বন, খাদ্যে— হালাল-হারামের বিধান মানা এবং সম্পর্কে— আত্মীয়তার হক রক্ষা করা ইত্যাদি।
৯. শরিয়া মানার ক্ষেত্রে ভারসাম্য জরুরি
শরিয়া মানার নামে বাড়াবাড়ি যেমন ঠিক নয়, তেমনি নিজের সুবিধার জন্য শরিয়ার বিধান উপেক্ষা করাও ঠিক নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ চান এবং তোমাদের জন্য কঠিন চান না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৫)
ইসলামের বিধান জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও সামর্থ্যের বিষয়গুলো বিবেচনা করে পালন করতে হয়। তাই কোনো জটিল মাসআলায় নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে যোগ্য আলেমের কাছে জিজ্ঞেস করা উচিত।
১০. শরিয়ার লক্ষ্য হলো মানুষের কল্যাণ
আল্লাহর বিধান মানুষের জন্য শাস্তি বা কষ্ট সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে নয়; বরং মানুষের ঈমান, জীবন, সম্পদ, পরিবার, বুদ্ধি, সম্মান ও সমাজকে সুরক্ষিত করার মধ্যে এর গভীর কল্যাণ রয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘আমি তোমাকে সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।’ (সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ১০৭)
শরিয়া পালনে আমাদের করণীয়
১. কোরআন ও সহিহ সুন্নাহ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা।
২. ফরজ ও হারাম বিষয়গুলো জানা ও মেনে চলা।
৩. হালাল উপার্জনের ব্যাপারে সতর্ক হওয়া।
৪. মানুষের হক আদায় করা।
৫. পরিবার ও সমাজে ইসলামী আদব-আখলাক প্রতিষ্ঠা করা।
৬. কোনো মাসআলা না জানলে যোগ্য আলেমের কাছে জিজ্ঞাসা করা।
৭. নিজের পছন্দের পরিবর্তে আল্লাহ ও রাসুল (সা.)-এর নির্দেশকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
৮. ধীরে ধীরে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান বাস্তবায়নের চেষ্টা করা।